৭১ এ কানাইঘাট

0

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের একটি সমৃদ্ধ জনপথ হচ্ছে কানাইঘাট। সিলেট শহর থেকে অদূরে প্রকৃতির লীলাভূমি সমৃদ্ধ ইতিহাস সমৃদ্ধ কানাইঘাটের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বাংলাদেশের অন্যান্য যেকোন অঞ্চলের চেয়ে কম নয়। এই অঞ্চলের যুদ্ধের ইতিহাস যেমনি সমৃদ্ধশালী ঠিক তেমনি অনেক বেদনাদায়কও বটে। কানাইঘাট উপজেলার উত্তরে আসাম ও মেঘালয় পশ্চিমে জৈন্তাপুর উপজেলা আর দক্ষিণে গোলাপগঞ্জ উপজেলা ও বিয়ানীবাজার উপজেলা অবস্থিত। কিছু কিছু জায়গায় টিলা আর বেশিরভাগ জায়গা সমভূমি নিয়ে এই অঞ্চলের প্রকৃতিগত অবস্থান।

এই অঞ্চলের পূর্বে রয়েছে জকিগঞ্জ উপজেলা যা সরাসরি ভারতের বর্ডারের সাথে মিল আছে।স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত কানাইঘাট গোয়াইনঘাট আর জৈন্তাপুর একই নির্বাচনী আসনে ছিল।যুদ্ধের পর ১৯৮৫ সালের দিকে কানাইঘাট আর জকিগঞ্জকে একীভূত করে আলদা একটা নির্বাচনী আসন তৈরী করা হয়। এর পর থেকে এই আসন সিলেট ৫ নির্বাচনী আসন বলে নির্বাচন করে আসছে। কানাইঘাট আর জকিগঞ্জ নিয়ে প্রথম নির্বাচন করা হয় ১৯৮৬ সালে। এর পর থেকেই এই অঞ্চলে সিলেট ৫ আসন হিসাবে অন্তর্ভুক্ত আছে।
১৯৭১ সাল। ২৫ শে মার্চ কালো রাত্রিতে যখন পাক হানাদার বাহিনী সারা দেশের উপর অকথ্য নির্যাতন চালায় তখন দিশেহারা হয়েছিল মানুষ। হণ্যে হয়ে দিকভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিল সাধারণ মানুষ। কেউ দেশ ছেড়ে বিদেশের মাটিতে আশ্রয় নিয়েছে আবার কেউ কেউ বিদেশের রিফিউজি ক্যাম্পে আশ্রিত হয়েছে। কেউ গ্রাম ছেড়ে পলায়ন করেছে অজানা উদ্দ্যেশে। কেউ জানতো না ঠিক পরক্ষণে কি ঘটবে বা কি ঘটতে যাচ্ছে আমাদের এই সোনার বাংলায়। রোজ রাতে যেভাবে মানুষ ঘুমাতে যায় ঠিক সেদিন ও অনেকেই ঘুমাতে গিয়েছিলেন কিন্তু সেই ঘুম থেকে আর জেগে উঠা হয় নি।কিছু মানুষের ঘুম সেই দিন থেকে চিরদিনের ঘুম হয়ে গিয়েছিল।

যুদ্ধের শোরগোল সারা দেশেই খুব কম সময়ে ছড়িয়ে পড়লো। সিলেট অঞ্চলে মার্চ মাসের শেষের দিকে এসে ধীরেধীরে ক্যাম্প করা শুরু করে দিলো পাকবাহিনী। কানাইঘাট অঞ্চলে যেহেতু কিছুটা দুর্গম এলাকা সেহেতু তাদের সেই অঞ্চলে যেতে কিছুটা ঝামেলা পোহাতে হয়েছে।জুনের মাঝামাঝি সময়ে পাক বাহিনী কিছু রাজাকারদের সহায়তায় কানাইঘাট বর্তমান ডাক বাংলোতে তারা ঘাটি তৈরী করে। ঘাটি তৈরী করার পর তারা আশেপাশের মানুষকে নানাভাবে হেনেস্তা করা শুরু করে। অনেককে দিয়ে তাদের নিত্য ব্যবহার্য কাজ এবং তাদের ক্যাম্পের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করতো। অগত্যা কথা না শুনলে চলতো অসহনীয় নির্যাতন। অনেকেই তাদের নির্যাতনের মাত্রা সহ্য করতে না পেরে এখন পর্যন্ত পঙ্গুত্ব বরণ করে আছেন।
কানাইঘাট পুরো অঞ্চল পাক বাহিনীর বিপদগামী সেনাদের অন্তর্ভুক্ত না হলেও অর্ধেকের বেশি জায়গা পাক বাহিনীর আওতায় চলে গিয়েছিল।তাদের মূলে রয়েছে কিছু কুখ্যাত রাজাকার। যারা চিরদিন দেশ ও জাতির চরম শত্রু কানাইঘাট সদর, সাতবাক, বড়চতুল, লক্ষীপ্রসাদ পূর্ব পশ্চিম ও দীঘিরপার সহ এই অঞ্চল মোটামুটি পাক হানাদার বাহিনীর হাতে চলে যায়। তারা নানাভাবে মানুষ নির্যাতন করা শুরু। ঘরবাড়িতে পুরুষ কাউকে পেলে তারা ধরে নিয়ে যেতো। মহিলারা ভয়ে ঘর বাড়ি ছেড়ে মা বাবার সাথে বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নেয়। আবার অনেকেই ঘরের নিচে গর্ত করে লুকিয়ে রাখতো।

যারা যুদ্ধ করতেন তারা সারাদিন বাড়ি পাহারা দিয়ে রাত্রি বেলায় বনে বাদাড়ে কিংবা হাওরে চরে বেড়াতেন যাতে করে পাক বাহিনী তাদের সম্পর্কে কোন খবর না পায়। কানাইঘাট এর মুক্তিযোদ্ধারা তারা কখনো খেয়ে না খেয়ে যুদ্ধ করেছেন।
কানাইঘাটের পরিচিত মুখ প্রিন্সিপাল সিরাজ স্যারের ভাষ্যমতে, কত দিন না খেয়ে থাকতে হয়েছে তার কোন হিসাব নাই। আবার মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বেশিরভাগ ছিলেন সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশের অন্যান্য জায়গার মত এই অঞ্চলেও সাধারণ কৃষক কিংবা উদ্দাম তরুণ যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছেন। তাদের সাহায্য করেছেন গ্রামের সাধারণ মানুষ। অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলামের ভাষ্যমতে, সারাদিন বাড়িতে থাকার পর রাতে হাওরে বা বাড়ি থেকে দূরে কোথাও অবস্থান করতেন। রাতের বেলায় তারা সুযোগ বুঝে হামলা করার চেষ্টা করতেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় কানাইঘাটের শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকলেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন যার ফল হচ্ছে অতি দ্রুত কানাইঘাট শত্রুমুক্ত হয়েছিল। কানাইঘাটের জনসাধারণ মানুষকে উদ্ভুদ্ধ করার জন্য অনেকেই বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছেন। মফস্বল হওয়ার কারনে অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছে পৌছা অনেক কঠিন হয়ে যেতো। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনেকেই যারা মুক্তিযোদ্ধাদের দেশপ্রেমের অনুপ্রেরণা দিয়েছেন তারা সাহস যুগিয়েছেন তারা নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন। দুর্লভপুর গ্রামের বাসিন্দা মরহুম ডা:ফয়জুল হক, বীরদল গ্রামের প্রিন্সিপাল সিরাজুল ইসলাম, জাউরা গ্রামের জমির উদ্দিন প্রধান, দুর্লভপুর গ্রামের ইঞ্জিনিয়ার মাহমুদ হোসেন, শিবনগর গ্রামের ছয়াই মিয়া আর ধর্মপুর গ্রামের মুবেশ্বর আলী তারা পুরো কানাইঘাট অঞ্চলের মানুষকে নানাভাবে যুদ্ধের প্রতি উদ্ভুদ্ধ করেছেন।

৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে কানাইঘাট ৪ ও ৫ নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিল। ৪ এর অধীনে ছিল করিমগঞ্জ কানাইঘাটের পূর্বাঞ্চলসহ পূর্ব সিলেট। আর ৫ নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিল জৈন্তাপুর থানাসহ উত্তরপূর্ব সিলেটের সুনামগঞ্জ অঞ্চল। এইসব অঞ্চলে নিয়ে ৪ ও ৫ নম্বর সেক্টর এর সমন্বয়ে এই অঞ্চল সমন্বিত ছিল। মেজর জেনারেল সি আর দত্তের নেতৃত্বে কানাইঘাট অঞ্চলে বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধ হয়। কানাইঘাট এ বিশেষ করে বড়দেশ থেকে শুরু করে একেবারে বর্ডার পর্যন্ত যুদ্ধের ভয়াবহতা লক্ষ্য করা গেছে।কানাইঘাটে অনেক মানুষ যুদ্ধের সময় পাক বাহিনীর হারে নির্যাতন হয়েছেন এমনকি কানাইঘাটে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যাও কম নয়। মোট ৮ জন শহীদ হন আর সরকারি হিসাব মতে ৬ জন। কানাইঘাটে মোট মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন ৩১৯ জন আর এখনো তাদের মধ্য হতে বেচে আছেন ১৯৫ জন মুক্তিযোদ্ধা। কানাইঘাটে মোট যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ১৪ জন। সব মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশ সরকারের নিয়ম অনুযায়ী ভাতা পান আর সরকারের পক্ষ হতে সব রকমের সাহায্য সহযোগিতা পান। ৪ জন মুক্তিযোদ্ধাকে সরকার ঘরবাড়ি তৈরী করার ও দায়িত্ব নিয়েছেন।

৭১ এ বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মত কানাইঘাটেও রাজাকারদের উৎপাত ছিল। তারা কানাইঘাটের অনেক উচ্চস্তরের মানুষকে পাক বাহিনী দ্বারা হত্যা করতে সহযোগিতা করেছে।পাকবাহিনীর আর দালাল-রাজাকারদের ভয়ে অনেক সাধারণ মানুষ নিজের ঘরে ঘুমাতো না।অনেক সময় রাজাকাররা বাড়ি থেকে মানুষকে ধরে নিয়ে গিয়ে পাকবাহিনীর হাতে তুলে দিতো।যারা যুদ্ধ করেছেন তাদের ভাষ্যমতে, কানাইঘাট পৌরসভায় একই জায়গায় ২২ জন মানুষের গণকবর দেওয়া হয়েছে। তাদের স্মৃতি অম্লান করে রাখার জন্য গণকবরে স্মৃতিসৌধ বানানো হয়েছে।

কানাইঘাটের মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে গৌরবময় ইতিহাস হল এখানে একজন বিদেশী বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন তার নাম জন ফার্গুসন নানকা। তার পিতামাতা জন্ম সুত্রে স্কটল্যান্ড এর বাসিন্দা। তারা ব্রিটিশ নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও আমাদের বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। বাংলাদেশ সরকার তাকে বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত করছে। তিনি এখন কানাইঘাট একটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং পারিবারিকভাবে লোভাছড়া বাগানেরও মালিক।স্ত্রী পুত্ররা ইংল্যান্ডে থাকলেও তিনি এদেশ ছেড়ে যান না এদেশ নাকি তার মায়ের মত। ব্রিটিশ শাসনামল থেকে তার বাপ-দাদারা এদেশে চাকরির সুবাধে আসলেও আর যাওয়া হয়ে উঠে নি। তারপর থেকেই তিনি বাংলাদেশের বাসিন্দা।ক্যাপ্টেন নিজাম উদ্দিন নামক আরেকজন বাংলাদেশী বীর মুক্তিযোদ্ধা কানাইঘাট পৌরসভায় মারা যান। জনশ্রুত আছে যে তিনি নাকি কুমিল্লার অধিবাসী।
যুদ্ধ যখন প্রায় শেষ পর্যায়ে ৪ ডিসেম্বর রাতে আনুমানিক ১০টার দিকে পাকবাহিনী আর আমাদের মুক্তিবাহিনীর সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধ হয় সুরমা নদীর দুই পাশ দিয়ে। এই সম্মুখযুদ্ধে পাকবাহিনীর প্রায় ৫০ জন সেনা মারা যায় আর আমাদের মুক্তিবাহিনীর দুই জন শাহাদত বরণ করেন। আমাদের মুক্তিসেনারা পাক বাহিনীর ১৩ জন সৈন্যকে গ্রেফতার করে। সেদিন রাতেই কানাইঘাটের অর্ধেকের বেশি অঞ্চলে স্বাধীনতা লাভ করে। পরের দিন ৫ ডিসেম্বর হাজার হাজার উৎফুল্ল মানুষের সামনে দুর্লভপুর গ্রামের কুখ্যাত রাজাকার আব্দুল মালিককে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সি আর দত্তের উপস্থিতিতে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।যতটুকু জানা যায় তার দেশদ্রোহী চারিত্রিক গুনাবলির কারনে হত্যা করা হয়। এরকম আরো অনেক ঘটনার সংমিশ্রণ কানাইঘাটের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।

৭১ এ যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্র উপহার পেলাম তাদের প্রতি আমাদের রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা। ৭১ এর চেতনায় নব উদ্যামে আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই দেশের হাল ধরবে এটাই আমার একান্ত বিশ্বাস। বাংলাদেশ অনেকদূর এগিয়ে যাক এটাই কামনা করি।

লেখা- আবু বকর সিদ্দিক

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here