সাজেকঃ মেঘের রাজ্য অথবা কুয়াশার চাদরে মোড়া অন্য বাংলাদেশ।

0
ছবিঃ সংগ্রহীত

সাজেক নামটি শুনলেই আমাদের মনের আকাশ বদলে যায় অন্য আকাশে। সেই আকাশে শুধুই থাকে সাদা রঙের মেঘ। মেঘের রাজ্য বলে পরিচিত সাজেকের নাম শুনলেই যে সাদা মেঘের চিন্তা আসবেই তা বুঝতে তো আর সবজান্তা হওয়া লাগে না। নীল সাদার দুনিয়ায় সাজেকের চকচকে ছবি দেখে আমরা যেই রূপ কল্পনা করি,সাজেক কি আসলেই সেই কল্পনার মত সুন্দর নাকি ঝাঁ চকচকে রেস্টুরেন্টের মেন্যুকার্ডের খাবার গুলোর মত ছবিতেই সুন্দর;বাস্তবে নয়। সাজেক ঘুরে এসে আমার একটাই উপলব্ধি হলো। তা হলো- সাজেক আমাদের কল্পনার চাইতেও সুন্দর এক রাজ্য। সাদার মেঘেদের পেঁজা তুলোর মত উড়ে বেড়ানোর শহর এই সাজেক।খুব বেশি উপমায় ভূষিত না করে সরাসরি বিস্তারিত বর্ণনায় চলে যাই।

ছবিঃ সংগ্রহীত

সাজেকের একটু বর্ণনা দিয়ে নিই প্রথমে, রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত সাজেক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠহতে প্রায় ১৮০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। খাগড়াছড়ি জেলা থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার আর দীঘনালা থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই সাজেক। ঢাকা থেকে তুলনামূলকভাবে খাগড়াছড়ি দিয়ে যাওয়াই সোজা। চারপাশে শ্বেতশুভ্র মেঘের রাশি আর মনোরম সবুজ পাহাড়ের সমারোহ।এই ছোট দুটি বাক্যই সাজেককে এক কথায় প্রকাশ করে। লোকমুখে যেটাকে বলে ফার্স্ট ভিউ,সেই ফার্স্ট ভিউতেই সাজেকের রূপ দেখে মুগ্ধ হতে আপনি বাধ্য। সাজেক যাওয়ার উপযুক্ত সময় হলো শরতকাল কিংবা বর্ষাকাল। তবে ভরা বর্ষায় সেখানে না যাওয়াই উত্তম। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক যাওয়ার পথেই মূলত ট্যুরের শুরুটা হয়। হুডখোলা জিপ কিংবা চান্দের গাড়িতে করে আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে যখন আপনি বন্ধুদের সাথে গানের কোরাসে তাল মেলাবেন আর দু পাশের পাহাড়ি প্রকৃতি দেখবেন তখন নিজেকে মনে হবে আপনি পৃথিবীর সবচাইতে সুখী মানুষ। এই গাড়িতে করে প্রথমে দীঘিনালা গিয়ে নামবেন।সেখানে রয়েছে হাজাছড়া ঝর্ণা।হিমশীত ঝর্ণার পানিতে শরীরের ক্লান্তি দূর করার খুব অভাব হবে সাজেকে। তাই সেই কাজটা এই দীঘিনালায়ই সেরে নিন। তারপর আবার উঠে পড়ুন চান্দের গাড়িতে। এবার সকাল ১০টা কিংবা বিকাল ৩টার মধ্যেই উপস্থিত হয়ে যান দীঘিনালা সেনানিবাসের এলাকায়। সেখান থেকে সামরিক বাহিনীর এস্কর্টে করে বাকিটুকু পথ পাড়ি দিয়ে দিন। তবে ভয় পাবেন না যেনো। সেনাসদস্যরা খুবই বন্ধুবৎসল। তবে মনে রাখবেন এস্কর্ট কিন্তু এই দুইবেলা ব্যতিরেকে আর ছাড়ে না। এবার দীঘিনালা থেকে সাজেক পর্যন্ত যেতে প্রায় সময় লাগবে তিনঘন্টার মতো। তবে,আপনি যদি হন ভ্রমণপিয়াসী এবং প্রকৃতিপিপাসু তবে এই তিনঘন্টাকে আপনার মনে হতে পারে তিন মিনিট। কেননা,আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ,পথের ধারের ঝর্ণা ইত্যাদি দেখে রোমাঞ্চে সময় যে কখন কেটে যাবে তা আপনি টেরও পাবেন না। সকাল ১০ টায় রওনা দিলে আপনি মোটামুটি দুপুর ১টার মধ্যেই পৌঁছে যাবেন আপনার কাংখিত সেই স্থানে;যার নাম রুইলুইপাড়া। তবে,পৌঁছেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে নেমে পড়বেন না যেনো। কারণ,আপনাকে রাতে থাকার জন্য বেছে নিতে হবে কটেজ। নিয়ে নিন আপনার সাধ্যানুযায়ী একটি কটেজ। মানভেদে ২০০-১২০০০ টাকা অবধি খরচের কটেজ আছে সাজেকে।

ছবিঃ সংগ্রহীত

কটেজ ভাড়া শেষে এবার আপনার পেট খিদেয় চোঁ-চোঁ করবে স্বাভাবিকভাবে। আপনার ভুক্তি নিবারণের জন্য সাজেকে দুই ধরণের হোটেল আছে, আদিবাসীদের এবং বাঙালীদের। আপনি বৈচিত্র্য চাইলে আদিবাসীদের হোটেলে গিয়ে খেতে পারেন ব্যাম্বু চিকেন কিংবা তাদের উপজাতীয় কোনো খাবার। আর,সাধারণ ভাত-ডাল খেতে চাইলে তো বাঙাল খাবার আছেই। তবে আপনি যেখানেই খান না কেনো আপনাকে খাওয়ার আগে আগেই অর্ডার করে রাখতে হবে। আমরা সেবার গিয়ে আগে আগে খাবার অর্ডার না করে বড্ড বিপদে পড়েছিলাম। খাগড়াছড়ি থাকতেই খাবার অর্ডার করলে সবচেয়ে ভালো হয়। সাজেকে বিদ্যুৎ নেই আমরা সবাই কমবেশি জানি। তাই, পাওয়ার ব্যাংক নেয়াটা অবশ্য কর্তব্য। তবে,সেখানে সোলার সিস্টেমের ব্যবস্থা আছে কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

ছবিঃ সংগ্রহীত

আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে সাজেকে রবি এবং টেলিটক ছাড়া অন্যকোনো নেটওয়ার্ক নেই। তাই,যাওয়ার আগে অবশ্যই এই দুটির একটি সিম নিয়ে যাবেন। দীর্ঘযাত্রা গেলো,খাবারের পর্বও গেলো। এবার আপনার শরীরটাকে একটু বিশ্রাম দিন। দুপুরের রোদে ঘোরাঘুরি না করে একটা ভাতঘুম দিন। রোদটাও পড়ে যাবে সেইসময়ে। তারপর,বিকেল বেলায় উঠে একটু ঘুরে আসুন সাজেকের একদম ভেতর থেকে।অনেক টিলার মধ্যে একটু উঁচু টিলা দেখে উঠে পড়ুন টিলার উপর।নিস্তব্ধ এক আদিম পরিবেশে নিরবে সূর্যাস্ত উপভোগ করুন।মেঘমুক্ত সাদা আকাশ দেখবেন হঠাৎই লালচে হয়ে গিয়েছে। তারপর,একটু একটু করে অন্ধকারে ধাবমান হচ্ছে এবং মিটিমিটি তারা জ্বলছে। এই ভ্রমণে আপনার প্রেয়সী যদি সাথে থাকে তাহলে তার চোখটা ক্ষণিকের জন্য বন্ধ রাখতে বলুন। আপনিও চোখটা বন্ধ করুন। কারণ,চোখ খুললেই দেখতে পাবেন আকাশ ভরা তারার মেলা যা কিনা আপনি জীবনেও দেখেন নি। মৃদু ঠান্ডা বাতাসের দোলায় এই মনোরম দৃশ্য উপভোগ করুন বেশ কিছুক্ষণ। জ্যোতির্বিজ্ঞান যদি হয় আপনার শখের বস্তু তাহলে আপনার জন্যই সাজেক। শতকোটি তারা,মিল্কিওয়ে, আকাশগঙ্গা ছায়াপথ এগুলোর দেখা কেবল আপনি সাজেকেই পাবেন।

ছবিঃ সংগ্রহীত

সেখান থেকে কটেজে ফিরে আসুন এবং ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ে চুমুক দিয়ে জমিয়ে আড্ডা দিন বন্ধুদের সাথে। রাতের পুরো মজা নিতে চাইলে করুন বারবিকিউ পার্টি। সাথে যদি কারো গিটার থাকে তাহলে তো সোনায় সোহাগা। গিটারের টুংটাং শব্দের সাথে বারবিকিউ চিকেনের সুঘ্রাণ এবং সজীব বাতাসের দোলায় আপনি যে স্বর্গীয় অনুভূতিপাবেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।রাতটায় জম্পেশ ঘুম দিন। তবে, মশা হতে একটু সাবধানে থাকবেন। পার্বত্য মশা অত্যন্ত ভয়ানক। ঘুম থেকে একদম ভোরে উঠে পড়ুন। কারণ,সূর্যোদয় দেখতে হবে তো! সূর্যোদয় দেখার জন্য আপনাকে আসতে হবে হেলিপ্যাড মাঠে। সূর্যোদয়ের এই মূহুর্তটি সাজেক ভ্রমণের অন্যতম একটি অংশ। সূর্যের তাজা আলো যখন মেঘ ঠিকরে বেরিয়ে আসে তখন এক নয়নাভিরাম দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। লিখে আসলে এই দৃশ্যের মাহাত্ন্য বোঝানো যাবেনা।

ছবিঃ সংগ্রহীত

সকালর নাস্তা করে আপনি চলে যেতে পারেন সাজেকের অর্থ্যাৎ রুইলুইপাড়ার শেষ গ্রাম কংলাকপাড়ায়।সাজেকের অন্যতম আকর্ষণ এই জায়গা। কংলাক পাড়া থেকে কর্ণফুলী নদীর উৎপত্তিস্থল ভারতের লুসাই পাহাড় দেখা যায়। এই গ্রাম থেকে চাইলে আপনি দুই ঘন্টা ট্রেকিং করে কমলক ঝর্ণা দেখে আসতে পারেন। অনেক তো ঘোরা হলো। এবার ফেরার পালা। তবে ফিরতে হলে যেভাবেই হোক আপনাকে সকাল ১০ টা কিংবা বিকাল ৩ টার আগে দীঘিনালায় পৌঁছাতে হবে। কারণ,প্রতিদিন এই দুইটাইমেই ওখান থেকে খাগড়াছড়িতে আর্মি এস্কর্ট যায়। দীঘিনালা থেকে খাগড়াছড়ি গিয়ে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হবার পূর্বে আলুটিলা রহস্য গুহায় যেতে একদমই ভুলবেন না। এই গুহায় মাত্র ১৫ মিনিটের এক রোমাঞ্চকর ভ্রমণ আপনার অভিজ্ঞতাকে ত্বরান্বিত করবে। যেন মনে হবে গভীর গুহায় হারিয়ে যাওয়া এক পর্যটক আপনি যিনি কিনা নতুন দেশ আবিষ্কারের সন্ধানে চলেছেন।গুহার ভেতরটা মিশমিশে অন্ধকার।তাই, আপনাকে সাথে করে অবশ্যই মশাল নিয়ে যেতে হবে যাগুহার বাইরে বিক্রি হয়। এই গুহায় যাওয়ার পথেই কাছেই রয়েছে একটি উঁচু টিলা।সময় থাকলে সেখান থেকেও ঘুরে আসুন।পুরো শহরটাকে এক ফ্রেমে পেয়ে যাবেন। তারপর,নিচের খালের হিমশীতল পানিতে ডুব মেরে আসুন।শরীরের সব জড়তা সেই পানিতে ধুয়েমুছে যাবে। এরপ,হৃদয়ে একরাশ স্মৃতি আর পূর্ণ উদ্যম নিয়ে কর্মস্থলের দিকে রওনা দিন।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here