‘রুটিন’

0

সকাল থেকেই রাফিদের মন খারাপ। একদম সকাল থেকে, তাও নয়। বরঞ্চ বহুদিন পর আজ ওর মনে হয়েছিল দিনটি ভালো কাটবে। টুকটাক লেখালেখির ঝোঁক আছে তার। একটা টপিক ভেবে রেখেছে। সেটা নিয়ে লিখবে। আগে বেশ গোছালো ছিল সে। প্রেমে পড়ার পর খানিক এলোমেলো হয়ে গেছে। প্রিয়তমার কলে ঘুম ভেঙ্গেছে। ‘গুডমর্নিং’ সম্বোধনটা তার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ এবং শ্রুতিমধুর শব্দ। প্রেয়সী লেখালেখি ভালোবাসে। রাফিদকে তাই সিরিয়াস হতে বলেছে বিষয়টা নিয়ে। সেও নিয়েছে সিরিয়াসলি। গত তিনদিন ধরে ঈশাকে (রাফিদের প্রেমিকা) একটা কথা বলবে বলবে করেও বলতে পারছে না। ঈশা দারুণ কর্মচঞ্চল। সারাদিন ব্যস্ত থাকে। আর রাফিদ সারাদিন কথা জমায়। প্রেয়সীকে শোনাবে বলে। কাজে ব্যস্ত থাকায় ঘরে ফিরে ক্লান্ত ঈশা হয় ঘুমিয়ে পড়ে, নতুবা তার তখন কোনকিছু করতে ইচ্ছে করে না। রাফিদেরও আর বলা হয় না। তবুও অনেক কথাই বলে, কিন্তু যেটা বলতে চায় সেটা বলতে ঘুম ঘুম চোখ উপযুক্ত নয়। নতুন করে লেখালেখি ঈশার পছন্দের একটা টপিক দিয়ে শুরু করতে চায় রাফিদ। নতুন প্রেম করছে। নিজের সম্পর্কে সব বললেও ঈশার সমন্ধে তেমন কিছু জানে না। জানবে কি করে? নিজের কথা বলেই তো কূল পায় না। ঈশা বড্ড ধৈর্য্যশীল। নইলে তার বকরবকর শুনে যেতে পারত না। রোজ ভাবে, এবার একটু মেয়েটার কথা শোনা যাক। কিসের কি, নিজের কথা বলতে শুরু করলে থামাথামির জো নেই।

সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর রাফিদ সারাদিনের রুটিন করে নিয়েছে মনে মনে। বাসায় কেউ নেই। ফ্রিজে খাবার আছে। বের করে রাখবে। ঘরদোর গোছাবে আজ। বিছানাটা দেখে নিজেই অবাক, এত হযবরল দশা! এক কোণায় কোলবালিশ, দুমড়ানো কাঁথা, বালিশের পাশে ইয়ারফোন, পাওয়ার ব্যাংক, তিনদিন ধরে পড়ে থাকা লিপজেল, বিছানার চাদরে ধুলোর আস্তরণ দেখে গা গোলাচ্ছিল। কয়েকদিন আগে ভ্রমণ করে এসেছে। একগাদা জামাকাপড় ময়লা হয়ে আছে। কাল থেকে রোজা শুরু। ধুতে হবে আজই। ডিটারজেন্ট দিয়ে ভিজিয়ে নিলো সেগুলো। ফ্রেশ হয়ে সকালের খাবারও সেরে নিলো। আপাতত কাজ নেই। কাল রাতের অসমাপ্ত কবিতাটা শেষ করা যেতে পারে। ঈশাকে একটা কল দিবে ভাবছে। কলেজ থেকে ফিরবে কখন জানতে হবে। ফিরলেই পছন্দের বিষয় জেনে লিখা আরম্ভ করবে। ভীষণ এক্সাইটেড সে। এতটাই যে, ঘরে খাওয়ার পানি নেই অথচ বাইরে পানির লাইন অফ করে দেওয়ার সময় হয়েছে তাও উঠছে না। ঈশা কল দিয়ে একবারে না পেলে দ্বিতীয়বার কল দেয় না। রাগ করে। ওকে শুধু শুধু রাগাতে একদমই ভালো লাগে না রাফিদের। কল এলো ফোনে, ঈশা মেসে ফিরেছে।

– ভিডিও কলে আসো
– উঁহু। ক্লান্ত লাগছে।
রাফিদ কিছু বলে না। বাইরে যা রোদ, বিশ্রাম নিয়ে নিক। সে অবশ্য চায়, ক্লান্তির মাঝেও ঈশা তাকে কল দিক। রাফিদ তো দেয়। যত কাজেই থাকুক, যত ক্লান্তই থাকুক তার মন পড়ে থাকে প্রিয়ার কাছে! কখন ফিরবে, ফিরে কল দেবে, একনজর দেখবে! তাতে শরীরের ক্লান্তির ছিটেফোঁটাও দূর হয় না, তবে মানসিক ক্লান্তি নিমিষেই উবে যায়। রাফিদকে যখন বলে- ফ্রেশ হয়ে আসো, তখনই অর্ধেক চাঙ্গা হয় সে। এসব আদিখ্যেতা ভালো লাগে না বলেই ঈশা বাস্তবতায় বিশ্বাসী।
কিছুক্ষণ পর ঈশাই ভিডিও কল দেয়। তার সামান্য আগে রাফিদের বড়ভাই কল দেয় তাকে। কার যেন রক্ত লাগবে। রাফিদের ব্লাড গ্রুপ মিললেও ভাইয়া মানা করে। মন খারাপ হয় রাফিদের। ঈশাকে জানালে, তাকে একপ্রকার ধুয়ে দেয়। অথচ, এখন পর্যন্ত যতবার কেউ রক্তের জন্য তাকে বলেছে সে নিজে না দিলেও প্রতিবারই ম্যানেজ করে দিয়েছে। একবার এমনকি বাড়িতে বসেই ঢাকায় থ্যালাসমিয়ায় আক্রান্ত এক শিশুর জন্য রক্তদাতা যোগাড় করে দিয়েছে। এক দুইজন নয়, প্রতি সপ্তাহেই দুই তিন ব্যাগ রক্ত লাগত শিশুটির। কয়েক সপ্তাহের রক্তদাতা ঠিক করে দিয়েছিল রাফিদ। এগুলো উপকার নয়? ঈশা যে বলল- নিজেই দিতে হবে রক্ত! পরোক্ষ অবদান তাই কিছুই নয়। রাফিদের মন খারাপের সে’ই শুরু…

কাল থেকে রোজা। ঈশার মেসের সবাই মিলে বাইরে খেতে যাবে দুপুরে। তারপর হ্যাংআউট। রাফিদের মনে অন্যরকম খুশি খেলা করে। ঈশার চঞ্চল হাসিমাখা মুখটা কল্পনা করে সে মিষ্টি একটা হাসি দেয়। কেউ দেখে না তা। মানুষের অকৃত্রিম হাসিগুলো কেউ দেখে না, দেখতে নেই। এই আধঘন্টায় ঈশা ভিডিও কলে আসছে, যাচ্ছে। যাচ্ছে, আসছে! রাফিদ তার কথাটা বলার সুযোগই পাচ্ছে না। ঈশার একটা বান্ধবী এসেছে, তাদের সাথে সেও যাবে। রাফিদের কল কেটে গোসল করতে চলে গেল ঈশা। নিজে নিজে হাসলো রাফিদ। চাপা হাসি। নিজেকেই নিজে ব্যঙ্গ করা হাসি। মন খারাপটা আরো গাঢ় হলো।

একা একা থাকতে পছন্দ করা ঘরকুনো ছেলেটা অল্পেতেই হতাশ হতো আগে। ঈশার গা ছুঁয়ে শপথ করেছে অল্পতেই মুষড়ে পড়বে না আর কখনো। সহজ বিষয়কে জটিল করে তুলতো রাফিদ। গতকাল দুটি বিষয় দারুণভাবে সামলেছে। তার মনে হলো- সে কথা রাখতে পারবে। ঈশাকে গল্পগুলো বলা দরকার। এক রাত পরেই তারাবি, সাহরি এসব নিয়ে ব্যস্ত হবে সবাই। রাত জেগে তেমন গল্প করা হবে না এই একমাসে। রাফিদ চেয়েছিল, গতকাল রাতটা নির্ঘুম কাটাতে। ঈশা একদম বাচ্চাদের মতোন। ঘুম এসেছে, ঘুমিয়ে গেছে। প্রিয়তমার ঘুমিয়ে যাওয়ার দৃশ্যও অনন্য। রাফিদও মুগ্ধ হয়ে দেখে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে একটাই শব্দ বের হয়- ‘পাগলী’।

ফোন অফ করে রেখেছে রাফিদ। নাহলে ঈশাকে জ্বালাতে ইচ্ছে করবে। শুধু একটা সমস্যা না আজ। দিনটা যেদিন বিরুদ্ধে যাবার পণ করে সবদিক থেকেই ঝামেলা আসে। হঠাৎ করেই মাথাব্যথা শুরু হলো ওর। মনে হচ্ছে দুনিয়াটা ঘুরছে। পারিবারিক কিছু সমস্যা, বন্ধুদের ভুল বোঝাবুঝি সব মিলিয়ে যাচ্ছেতাই অবস্থা। দুপুরবেলা ওর মনে হলো হাত পা খিঁচে আসছে। একা একা চিৎকার করছে রাফিদ। অজ্ঞান হবার জো তার। পাশে কাউকে ভীষণ প্রয়োজন। নিজের শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে একটু একটু করে। তারপর আর কিছু খেয়াল নেই তার। যতক্ষণ হুঁশ ছিল, খালি ঈশার কথাই মনে পড়েছে। কিন্তু এই মূহুর্তে ঈশাকে কল দিয়ে তো লাভ হবে না। রাফিদ তো ঈশাকে কথা দিয়েছে সে স্ট্রং থাকবে। রাফিদ আবেগী। অল্পেই অনেক কিছু ভেবে নেয়। তারপর অসুস্থ হয়। এতদিনের বদঅভ্যাস যেতে সময় লাগবে, ঈশাকে সেটি বোঝাবে কে? ঈশা রাফিদের ভালোর জন্যই বলে সেসব। মেয়েটা প্রচন্ড ভালোবাসে তাকে। রাফিদ বোঝে। এমনকি এটাও বোঝে- সে যতটুকু ভালোবাসে ঈশাকে, তার প্রতি ঈশার ভালোবাসা এরচেয়ে প্রবল!

বিকালে সম্বিত ফিরে পেলে ফোনটা অন করে রাফিদ। অন করতেই ঈশার কল। অনবরত প্রশ্ন ছোঁড়া…
তোর ফোন অফ কেন?
কই ছিলি?
আমার খবর নেয়ার তো কোন দরকার নেই, না?
আরো কত প্রশ্ন!
ঈশা আজ আপুদের সাথে যেখানে ঘুরতে গেছে মাত্র কয়েকদিন আগেই রাফিদের সঙ্গে সেখানে গেছিল। কত দারুণ স্মৃতি রেখে এসেছে ওখানে। ভেবেছিল দুজন স্মৃতিচারণ করবে। কিন্তু কিসের কি! রাফিদটা উল্টো উন্মাদ হয়ে পড়ে আছে।

সন্ধ্যাবেলা কল দিল ঈশা। এখনো রাগ ভাঙ্গেনি ওর। সবাই চলে গেলেও একলা বসে আছে ওখানে। রাফিদের কোন কথা শুনছে না। ফোন কেটে দিচ্ছে। এদিকে রাফিদকে পরপর দুইজন বন্ধু কোন একটা বিষয় নিয়ে যা নয় তা বলে দিলো ফোনে। সে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে। কিছুক্ষণ পর ওর আব্বা এসেও ধমকিয়ে গেল। সে হাসছে। জীবন তাকে নিয়ে খেলছে। সবসময় কিছু করতে না পারাটাও ব্যর্থতা নয়। কেউ ভুল বুঝলে তখন দুনিয়াটাই অন্ধকার মনে হয়। এতটাই যে, রাফিদ নিজের ব্রাশ কোনটা সেটাও চিনতে পারে না। ঈশা বেশ কর্কশ স্বরে কথা বলছে। মেয়েটার অভিমান করা একদম জায়েজ। রাফিদের চিন্তা হচ্ছে ওকে নিয়ে। কল দিতেও নিষেধ করেছে!

আজকের সন্ধ্যাটা একেবারে অন্যরকম। অনেকগুলো ভুল বোঝাবুঝির বেদনাকাব্য রচিত হলো আজ। মানুষ কেন তাকেই এত ভুল বোঝে তার বোধগম্য হয় না। রাফিদ জানে, তার অহেতুক অত্যাচারে একদিন সব আপনজন তাকে ছেড়ে যাবে। ঈশাকে সব কথা বলা যায় অনায়াসে, কিন্তু সে ও তো মানুষ। সবচেয়ে বড় কথা রাফিদের এই সমস্যাজর্জর লাইফের সঙ্গে সে এতটুকুনও পরিচিত নয়। তারচেয়েও বড় কথা ওরা দুইজন দুইজনকে ভালোবাসে। ভালোবাসায় অন্য সব কিছুই গৌণ।

পেটটা ব্যথা করছে রাফিদের। মাথা ভনভন করছে। ঈশা এখনো কল দেয়নি। দেবে কি না তা ও জানে না। প্রচন্ড টেনশনে রাফিদের পেট ব্যথা করে। বিছানাতেই বমি করে দিলো। চোখমুখ অন্ধকার হয়ে আসছে ওর। ঈশা ঈশা বলে মৃদুস্বরে ডাকছে। ঈশার তা শোনার কথা নয়। বহুদূরে বসে সে অনুভব করছে কি না কে জানে। কাল প্রথম রমজান। রাফিদ চেয়েছিল লাইফটাকে একটা নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসবে। অগোছালো লাইফে রুটিনওয়ার্কটা দরকার। অথচ, রুটিনমাফিক চলতে চাওয়ার প্রথম দিনেই এত্তো এত্তো ভুল বোঝাবুঝি। ঈশা শেষবার কল দিয়েও জানতে চেয়েছিল- কেন ফোনটা অফ রেখেছিলে? রাফিদ চুপ করে ছিল। ঈশা মানতে পারেনি। রাফিদের ভেতরে থাকা মনুষ্যত্বও ঈশাকে কষ্ট দেওয়াটা মানতে পারেনি। অন্যসময় হলে ঘুমের ওষুধ খুঁজতো নির্ঘাত। কিন্তু ঈশাকে দেওয়া কথা ফেলবে কি করে? রাফিদের মাথা ভারী হয়ে আসছে। এই বুঝি চোখ বুঝলো! চোখেরা বন্ধ হতে হতেও হচ্ছে না। ওদের সামনে যে ভাসছে ঈশার লাজুক চেহারা, যখন রাফিদ ওর কপালে টিপ পড়িয়ে দিয়ে স্নেহচুম্বন দিচ্ছিল!

লিখা- জহিরুল কাইউম ফিরোজ
নিয়মিত লেখক, অপরাহ্ন বাংলা।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here