মোহনলাল : মনোমুগ্ধকর মলিউডের ম্যাসিভ ম্যান

0

সাফল্য আসে পরিশ্রমের হাত ধরে। পরিশ্রম আসে মেধার হাত ধরে। মালায়লাম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির মহাতারকা ‘মোহনলাল বিশ্বনাথ’ মেধা আর শ্রমের সম্মিলনে সাফল্যে এনেছেন। চার দশকের ক্যারিয়ারে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য চূড়ায়। ভারতীয় চলচ্চিত্রেরই মোস্ট কমপ্লিট অ্যাক্টর মোহনলাল যেন কেরালার এক টুকরো প্রশান্তি।

তায়কোয়ান্দোতে ব্ল্যাক বেল্ট পাওয়া ‘লালেট্টা’ (ভক্তরা মোহনলালকে আদর করে লালেট্টা ডাকে) ক্যামেরার সামনে প্রথম দাঁড়ান ১৯৭৮ সালে। বন্ধুরা মিলে তৈরি করেন ‘তিরানোট্টাম’ নামের সিনেমা যাতে কুটাপ্পা চরিত্রে অভিনয় করেন মোহনলাল। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল এই কুটাপ্পা! প্রথম ছবিতেই ভিন্নধর্মী কিছু করার চেষ্টা সফলতার মুখ দেখেনি। সেন্সর জটিলতায় সেটি মুক্তিই পায়নি। ১৯৮০ সালে পরিচালক ফাজিল তার প্রথম ছবির জন্য একটা নতুন মুখ খুঁজছিল। ‘মঞ্জিল ভিরিঞ্জা পোক্কাল’ মুভিতে দুর্ধর্ষ ভিলেনের ভূমিকায় অভিনয় করে ছাড়িয়ে গেছেন হিরো শঙ্করকেও! তারপর আর পিছু ফিরতে হয়নি তাকে। সিনেমার বক্সঅফিস সাফল্য আর দক্ষ অভিনয়ের উপহারস্বরুপ পরের চার বছরে একে একে ২৫টি সিনেমায় কাজ করেন মোহনলাল, যার অধিকাংশ নেগেটিভ রোলে। আলোর মুখ না দেখা নিজেদের বানানো ওই মুভিতে সহকারী হিসেবে থাকা একজন বন্ধু ছিল প্রিয়দর্শন। ততদিনে পরিচালনায় নাম লিখিয়েছেন তিনি। ১৯৮৪ সালে বন্ধু মোহনকে দিয়ে করিয়ে নেয় কমেডি ড্রামা ‘পোচাক্করু মক্কুত্তি’, বক্স অফিসে পায় বিগ হিটের তকমা।

১৯৮৬ সালকে মোহনলালের ক্যারিয়ারের মোস্ট ভ্যালুয়েবল সাল বললে ভুল বলা হবে না একরত্তিও। একবছরে ৩৪টি সিনেমা রিলিজ করার বিশ্বরেকর্ডের জন্যে নয় শুধু, সে বছরই সুপারস্টার হবার পথে একধাপ এগিয়ে যান লালেট্টা। নির্মাতা থাম্পি কান্নাথানাম তার নেক্সট প্রজেক্ট ‘রাজাভিন্তে মাকান’ ছবির জন্য ম্যামুত্তিকে চুক্তিবদ্ধ করলেও শিডিউল জটিলতায় কাজটা ছেড়ে দেন মেগাস্টার। তাতে নতুন করে চুক্তি স্বাক্ষর করেন মোহনলাল। এর পরের গল্পটুকু সোনার হরফে লিখে রাখবেন মোহনলাল। মুক্তির পর মালায়লামের অন্যতম বিগেস্ট হিটের তকমা পেয়ে যায় রাজাভিন্তে মাকান, আর লালেট্টার কপালে লাগে সুপারস্টারের তকমা। ১৯৮৮ তে বন্ধু প্রিয়দর্শনের সাথে ফের জুটি বাঁধেন। ‘চিত্রম’ টাইটেলের মুভিটি গড়ে এক অনন্য রেকর্ড! ৩৬৫ দিন, মানে গোটা একটা বছরজুড়ে কেরালার কোন না কোন থিয়েটারে চলেছেই এটি, মালায়লি মানুষ সাক্ষী হয় নতুন এক উপাখ্যানের। মুভিতে সহজ সরল বালক কিরেদামের চরিত্র রূপায়ন করে হাতে তোলেন ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড, জুরি বোর্ডের পছন্দের ভিত্তিতে।

শুরু থেকেই চলচ্চিত্রে মোহনলালের ভিত ছিল শক্ত। সেই খুঁটির উপর দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে পরিণত করেন কেরালার অন্যতম বড় এই মশলা ব্যবসায়ী। ‘৮৮ তে জুরি বোর্ড ম্যানশনে পুরস্কার জিতলেও সেরা অভিনেতা হিসেবে প্রথম জাতীয় পুরস্কার পান ১৯৯১ সালে ‘ভারাতাম’ সিনেমার মাধ্যমে। আট বছর বাদে ‘৯৯ তে আবার পান ‘ভানাপ্রস্থাম’ এর মধ্য দিয়ে। একে একে অসংখ্য হিট ছবির জন্ম দেন তিনি। থুভানাথুম্বিকাল, নারোদিকাতু, আক্কারে আক্কারে আক্কারে, চন্দ্রলেখা- উল্লেখযোগ্য কাজ। কমেডিয়ান শ্রীনিবাস আর মোহনলালকে মুভিতে নাও, হিট নিশ্চিত- নব্বইয়ের দশকে মালায়লাম ইন্ডাস্ট্রিতে সাফল্যের টোটকা ছিল অনেকটা এমনই! এই জুটির অধিকাংশই ইন্ডাস্ট্রি হিটের তকমা পাওয়া, ২০০৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘উড়ায়ানানানু থারাম’ তো তাদের অন্যতম সেরা কাজ, সবচেয়ে বড় হিট!

উত্থান যেখানে আছে, পতনের গল্পও থাকবে সেখানে। কমপ্লিট অ্যাক্টর মোহনলালের ক্যারিয়ারেও আছে আপ অ্যান্ড ডাউনস! ২০০০ সালে ‘নারশিমা’ সিনেমা দিয়ে মলিউডে নিজেকে অনন্য এক উচতায় নিয়ে যান তিনি। শাজি কৈলাসের নির্মাণে সেই মুভি বক্সঅফিস ভেঙ্গেচুরে দেয়। লালেট্টা বনে যান সুপার হিউম্যান। কিন্তু খুব বেশিই হয়ত উপরে উঠে গিয়েছিলেন। তাকে নিয়ে ভক্তদের আশার পারদও চড়তে শুরু করে তরতরিয়ে। ফলাফল- প্রাজা, ওনামাম, থান্ডাভাম- টানা ফ্লপ যেতে থাকে মুভি; কমতে থাকে খ্যাতি। তবে তিনি মোহনলাল যিনি ভিলেন থেকে শুরু করে অ্যাকশন, কমেডি, রোমান্টিক, এক্সপেরিমেন্টাল ক্যারেকটার সবকিছুতেই নিজের মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন! যার সমন্ধে রজনীকান্ত বলেন- তিনি এমন কিছু চরিত্র করেছেন, যেগুলো আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না! এমন একজন মানুষের ফেরাটা সময়ের ব্যাপার। তিনি ফিরেওছেন। ২০১৩ সালে মুক্তি পায় ‘দৃশ্যম’, গোটা ভারতেরই অন্যতম সেরা একটি থ্রিলার ভাবা যেই সিনেমাকে। চমৎকার ন্যাচারাল অভিনয়ে রাজার মতোই ফিরেন তিনি। ছবিটি আয় করে ৭৫ কোটি রূপি!

মোহনলাল যেন মলিউডের বক্সঅফিস মনস্টার! ছোট্ট এক ফিল্মপাড়া, সেখান থেকে ১০ কোটিও একসময় অনেক মনে হতো! অথচ সেখান থেকেই মোহনলাল বের করেছেন ১০০ কোটির সিনেমা। এতেই থমকে গেলে হবে না। পিছন ফিরে তাকালে দেখবেন মলিউডের প্রথম ৫,১০,২০,৩০, ৫০, ১০০ কোটি আয় করা সবগুলো মুভির অভিনেতার একজনই- মোহনলাল বিশ্বনাথ। এতটাই ক্রেজ যে, বাহুবলি ২ প্রায় সব রাজ্যের রেকর্ড চুরমার করলেও অক্ষত থাকে মোহনলালের পুলি। কেরালার সর্বোচ্চ ১৬৫ কোটি রূপি আয় করা পুলিকে টপকাতে পারেনি শুধু ভারতে সর্বোচ্চ আয় করা বাহুবলি। তেলেগুতে জনতা গ্যারেজ নামে ছবিতে এনটিআর জুনিয়রের সঙ্গে জুটি বেঁধেছেন, সেটিও বক্সঅফিসে ১০০ কোটি ছাড়ায়। যা মোহনলালকে এনে দেয় দারুণ অর্জন। একমাত্র মলিউড অভিনেতা হিসেবে মালায়লাম এবং তেলেগু দুই জায়গায় ১০০ কোটি আয় করা ছবি রয়েছে তার ঝুলিতে।

বয়স ষাট ছুঁইছুঁই। বয়স যত বাড়ছে পরিণত হচ্ছেন যেন। লিজেন্ড ম্যামুত্তির সাথে একটা অদৃশ্যমান প্রতিযোগিতায় দুজন যতটা লাভবান হচ্ছেন, কয়েকগুণ বেশি হচ্ছে মলিউড। সমৃদ্ধ হচ্ছে অর্জনের ভান্ডার মলিউডকে এখন সমীহের চোখে দেখে সবাই, যার কৃতিত্বের অনেকখানি ভার মোহনলালের। ‘উড়িয়ান’, এরপর ‘রান্দামোঝামের মতো কাজগুলি কেরালার ফিল্মপাড়াকে আরো পরিণত করেছে। ফেসবুক, টুইটার প্রতিনিয়ত সরগরম থাকে লালেট্টার নিত্যনতুন লুক, চ্যালেঞ্জিং কাজের জন্য। পরিচালক রাম গোপাল ভার্মা একবার বলেছিলেন- কাজ দিয়ে যদি ডিরেক্টরদের শতভাগ খুশি কেউ করতে পারে সেটি মোহনলাল। মনি রত্নম তো বলেই দিয়েছেন- তার সঙ্গে কাজ করতে গেলে আমি কাট বলতে ভুলে যাই। তবে সবাইকে ছাপিয়ে অমিতাভ বচ্চনই হয়ত বলেছেন সবার না বলা কথা- তিনি চমৎকার অভিনেতা!

ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছ থেকে কর্ণেল উপাধি পাওয়া একমাত্র অভিনেতা মোহনলাল ২০০৬ সালে নির্বাচিত হন কেরালার সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবে। তিনি ম্যামোত্তির মতো মেগাস্টার নন, ডায়লগ পাঞ্চের জন্য বিখ্যাত সুরেশ গোপি নন, তিনি সবার চেয়ে আলাদা। সবকিছুর মিশ্রণ! ক্যারিয়ারে ২০টি ব্লকবাস্টার সিনেমা উপহার দেওয়া লালেট্টাকে এমনি এমনিই তো আর ‘কমপ্লিট অ্যাক্টর’ বলা হয় না!

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here