নোভাঃ হারিয়ে ফেরা এক ইতিহাস

0
ছবিঃ নোভা

নোভা! হ্যা, বলছিলাম নোভার কথা; বাংলাদেশ ব্যান্ড মিউজিকের একটি ইতিহাসের কথা। নোভার শুরু’টা হয় মূলত ৮০’র দশকের শেষভাগে আহমেদ ফজলের হাত ধরে। তারপর একটু একটু করে নিজেদের পথ বিস্তৃত করে নোভা।

নিজেদের প্রথম অ্যালবাম আহবান দিয়েই যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সফল এই ব্যান্ড। প্রকাশিত এলবামের টাইটেল ট্র্যাক মাদকাসক্ত নিয়ে প্রত্যাশা যেমন ছিলো প্রাপ্তিও ছিলো সেরকম ই। নোভা ব্যান্ডের আত্মপ্রকাশে এই ট্রাক সেইসময় কার্যকর ভূমিকা পালন করে। মূলত এই ট্রাক দিয়ে মেইনস্ট্রিমে চলে আসে তারা। যেটা ছিলো নোভা ব্যান্ডের সফল পথচলা শুরুর মূল প্রেরণা। মাদকাসক্ত গানটি এতটাই জনপ্রিয়তা পায় যে, সেই সময় সরকার মাদকবিরোধী এই গানকে পুরষ্কারে ভূষিত করে কিন্তু নোভা সেই পুরষ্কার প্রত্যাখান করে!

ছবিঃ সংগ্রহীত

নোভার দ্বিতীয় অ্যালবামের নাম ছিলো ‘রাজাকারের তালিকা চাই’। এলবামের টাইটেল ট্রাক’ও ছিলো এটি। গানটি ছিলো মূলত পিংক ফ্লয়েডের বিখ্যাত ‘ওয়াল’ গানটির অনুকরণে গাওয়া। সম্ভবত এই গানটি’ই বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম গান, যে গানে প্রকাশ্যে রাজাকারের বিচার চাওয়া হয়।

এই একটা মাত্র গানের জন্যই তৎকালীন সরকার নোভা ব্যান্ডকে বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করে। যদিও সেটা বেশিদিন বহাল থাকে নি। নিষিদ্ধ হওয়ার মাত্র এক বছর পরেই বাংলাদেশ ইতিহাসের প্রথম নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার নোভা ব্যান্ডের উপর থেকে সকল নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।

ছবিঃ সংগ্রহীত

ব্যান্ড সঙ্গীতের সাথে ব্যান্ডের সদস্য পরিবর্তনের ব্যপার’টা পুরো দুনিয়াতে’ই স্বাভাবিক ব্যাপার হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশ ব্যান্ড মিউজিক ইন্ড্রাস্ট্রিতে সবচেয়ে বেশী পরিবর্তনের ছৌঁয়া পেয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ড ওয়ারফেজ। যেখানে তাদের মেম্বার পরিবর্তন হয়েছে প্রায় নিয়মিত বিরতিতেই। তবে নব্বইয়ের দশকে মেম্বারদের ব্যান্ড ছেড়ে যাওয়ার প্রবণতা নোভাতেই ছিলো সবচেয়ে বেশী। সেটা তাদের লাইনআপ দেখলেই স্পষ্ট হওয়া যায়।

ছবিঃ সংগ্রহীত

তাদের পূর্ববর্তী লাইন আপ-
১. আহমেদ ফজল (ভোকাল)
২. ভাল (বেজ)
৩. তোলো (কিবোর্ড)
৪. ময় (ড্রামার)
৫. শাকিল খান (গেস্ট ভোকালিস্ট)
৬. চারু (বেজ)
৭. জয় (বেজ)
৮. রুবেল (ড্রামার)
৯. পাপ্পু (কিবোর্ড)
১০. শ্রী (ড্রামার)
১১. ইমরান (গিটারস্নড)
১২. এন্টোনি সামিউল (ড্রামার)
লাইন আপ দেখে অবাক হচ্ছেন? আসলে তাদের লাইনআপ অবাক হওয়ার মতোই ছিলো। আর এই লাইন আপ’ই জন্ম দিয়েছিলো একাধিক বিস্ময়; একাধিক কালজয়ী গান।

ছবিঃ সংগ্রহীত

নোভার প্রকাশ করা অ্যালবামগুলো হলো-
১. আহবান
২. রাজাকারের তালিকা চাই
৩. স্কুল পলাতক মেয়ে
৪. ভাইসো
৫. ঠিকানা
৬. রিটার্ন অফ দ্যা নোভা
এগুলা ছাড়াও নোভা আরও কিছু মিক্সড অ্যালবামে নিজেদের গান প্রকাশ করে।

আচ্ছা, ৯০’দশকের যারা ব্যান্ড মিউজিক শুনতেন, তাদের স্মৃতিতে একটু ধাক্কা দেয়া যাক!
“রেশমি চুড়ি হাতে এলোমেলো চুল,
স্কুল পলাতক মেয়ে করেছে ব্যাকুল”
মনে আছে গানটির কথা?
কিংবা, “আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ করবে তোদের চির অবসান,
আসছে এই প্রজন্ম মুক্তিযোদ্ধাদেরই সন্তান!”

ছবিঃ সংগ্রহীত

বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় সাইকেডেলিক, হার্ড ও প্রোগ্রেসিভ রক ব্যান্ড নোভা। অনেক মানুষের কৈশরের স্মৃতি নিয়ে তারা আবার ফিরে এসেছে। সাথে ভালো খবর হচ্ছে, নতুন লাইন-আপে নতুন এলবামও প্রকাশ করবে ব্যান্ড নোভা। যদিও তাদের ফেরার বছরখানেক পার হলেও এলবামের ব্যাপার’টা এখনো স্থিতিশীল অবস্থাতেই আছে।
তবে ইতিমধ্যে তারা কবি জসীম উদ্দিনের বিখ্যাত আসমানি কবিতাটি গান আকারে প্রকাশ করেছে। উক্ত গানে বাংলাদেশ টেলিভিশনে পারফর্ম’ও করেছে নোভা।

নোভার বর্তমান লাইনআপ-
আহমেদ ফজল (ভোকাল, লিড গিটার),
অপু (কিবোর্ড), নুর (বেস), সোরেন (গিটার ও ভোকাল)
আশা করা যায়, নতুন লাইনআপে নোভা তাদের পুরনো অবস্থান ধরে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।

 

ছবিঃ সংগ্রহীত

যারা নোভার গান শোনেন’নি তাদেরকে আহবান করছি, সময় করে নোভার গানগুলো শুনতে পারেন। কথা দিচ্ছি নোভা আপনাকে নিরাশ করবে না।
নোভার অন্যতম জনপ্রিয় কিছু গান হলোঃ
প্রতিমার ছবি, আহবান, রাজাকারের তালিকা চাই, স্বপ্নরানী, স্কুল পলাতক মেয়ে, পদ্মার পাড়ে, স্বপ্নের বাংলাদেশ।

নোভা বাংলাদেশের ব্যন্ড মিউজিকের একটি গর্বিত ইতিহাসের নাম। যে ইতিহাস জন্ম দিয়েছিলো ফ্যান্টাসির, জন্ম দিয়েছিলো হাজারো সুন্দর বিকেলের। টিফিনের টাকা জমিয়ে যারা একসময় নোভার এলবাম কিনতো তাদের কেউ কেউ এখন একদম প্রোফেশনাল। কেউ কেউ হয়তো এখনো অফিসে ফাইল ভর্তি ডেস্কের সামনে বসে সময়ে সেই ব্যান্ড নোভাকে স্মরণ করে নস্টালজিয়ায় ভোগে।

নোভা ফিরেছে। এখন আশা, আমাদের প্রিয় ব্যান্ড ধরে রাখুক তাদের পুরনো ফ্লেভার; নোভায় জন্ম হোক স্কুল পলাতক নতুন কোন মেয়ের গল্প।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here