নীরবে নিভৃতে অভিমানে…

0
মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নিলে কিছুদিন পর সবাই তাকে ভুলে যায়। কিন্তু তবুও হরহামেশা, সময়ে-অসময়ে তাদের স্মৃতি, কথা, কাজ আমাদের আড্ডা কিংবা অলস সময়কে নস্টালজিক করে তোলে। আবার কিছু মানুষ বেঁচে থাকতেও আমাদের থেকে অনেক দূরে চলে যায়, হারিয়ে যায়। তারা বেঁচে থাকলেও আমাদের শুধুই তাদের স্মৃতি নিয়ে বাঁচতে হয়।
ক্রিকেটের সাথে এই ব্যাপারটার একটা অদ্ভুত মিল আছে৷ এই হারানো, খোঁজার ভীড়ে লুকিয়ে থাকা আইসিসি সহযোগী দেশগুলোর গল্প আমাদের মুগ্ধ করে, সাথে বেশীরভাগ সময় তাদের পথচলার হোঁচটগুলো করে তোলে বিষন্ন। প্রতি বিশ্বকাপের এই সহযোগী দেশগুলোর প্রতি আলাদা নজর থাকে ক্রিকেটপ্রেমীদের। প্রকৃতপক্ষে ২০০৭ বিশ্বকাপে ডোয়েন লেভেরকের সেই বিখ্যাত ক্যাচের মত মূহুর্ত একটি পুরো বিশ্বকাপ জমিয়ে তোলার ক্ষমতা রাখে। আজ ক্রিকেটে বারমুডার অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। তবুও সময়ে অসময়ে লেভেরকের সেই ক্যাচ আমাদের টং এর আড্ডাকে অনেক বেশী রাঙিয়ে তোলে।
গত বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ করতে না পারায় পিটার বোরেন এবং কোয়েটজার টুইটারে তাদের হতাশা প্রকাশ করেছেন। কোয়েটজারের টুইটে ছিলো নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ না পাওয়ার হতাশার সুর। হতাশা’ই তো স্বাভাবিক। কারণ নেদারল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড কিংবা স্কটল্যান্ডের মত দলগুলো হয়তো কোনদিন আবার বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পাবে৷ কিন্তু সেখানে কোয়েটজার, পিটার সিলার কিংবা পোর্টারফিল্ড’দের থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ কিছু স্বপ্নকে বয়সের কাছে পরাজয় বরণ করতেই হয়।
কেনিয়া আমাদের ক্রিকেটের একটি পরিচিত নাম। আমাদের আইসিস ট্রফি জয়, আমাদের প্রথম ৩০০ ছাড়াও অরো অনেক স্মৃতির সাথে কেনিয়ার নাম জড়িত। আইসিসি ট্রফিতে মার্টিন সুজির বলে হাসিবুল হাসান শান্তর অশান্ত করা দৌড় এবং আমাদের গৌরবের ইতিহাস কারোরই ভুলার কথা নয়। সেই মার্টিন সুজি এখন রুয়ান্ডা ক্রিকেট দলের কোচ। ক্রিকেট তাদের ছেড়ে গেলেও তারা ক্রিকেটটা ছাড়তে পারেননি।
নেপালের অধিনায়ক পরশ খাদকার ক্রিকেটে অভিষেক ২০০৪ সালে। বলাই যায় তার এবং তার মত অনেক খাদকার অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগের ফলেই আজ নেপালের মানুষ ক্রিকেটে স্বপ্ন দেখে, লামিচানেরা বিশ্ব মাতিয়ে বেঁড়ায়। নেপালের এই টিমটা বিশ্বকাপ খেলার সার্মথ্য রাখে। যদি তেমনটাই হতো তবে এতবছরের ত্যাগ, পরিশ্রমের সম্মানসূচক গত বিশ্বকাপ খেলতে পারাটাই হতো তার/তাদের জন্য ক্রিকেটের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় ফেয়ারওয়েল।
২০১৯ বিশ্বকাপের আগে দশ দল নিয়ে জিম্বাবুয়েতে বসেছিলো বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব। সেখান থেকে মাত্র সেরা দুটি দলের খেলার সুযোগ ছিলো বিশ্বকাপে। ইউএইর সাথে শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে হেরে স্বপ্ন ভাঙ্গে জিম্বাবুয়ের। তবে পুরো টুর্নামেন্ট অসাধারণ পারফর্মেন্সের জন্য উইনন্ডিজ-আফগানিস্তান ফাইনালের পর ম্যান অফ দ্যা টুর্নামেন্টের পুরষ্কার নিতে এসে সিকান্দার রাজা বলেছিলেন, ” এই ম্যান অফ দ্যা টুর্নামেন্টের ট্রফিটা আমাকে মনে করিয়ে দেবে ১৫ মিলিয়ন মানুষের স্বপ্ন ভঙ্গের কথা। এই ট্রফিটা আমাকে মনে করিয়ে দেবে পিটার বোরেনের কথা, কোয়েটজারের কথা। এই ট্রফিটা আমাকে মনে করিয়ে ইউএইর রোহান মোস্তফার কথা, আমাকে মনে করিয়ে দেবে যেই দুইটা দেশ ওয়ানডে স্ট্যাটাস হারিয়েছে তাদের কথা। আমি জানি আমি ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু ক্রিকেট’টা তো এমন’ই।”
যাইহোক, লর্ডসে দারুণ একটা ম্যাচ দিয়ে ক্রিকেট বিশ্বকাপের দ্বাদশ আসরের সমাপ্তি হয়েছে গত ১৪ই জুলাই। গ্যালারি ভর্তি দর্শক, ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ডের অল-রাউন্ডিং পারফর্মেন্স সেই ফাইনালকে করে তুলেছিলো উপভোগ্য,স্মরণীয়। কিন্তু বিশ্বকাপ যতই উত্তেজনা ছড়াক, কোন এক সন্ধ্যায় হয়তো বিশ্বকাপ ঠিকই নিরানব্বইয়ের জিম্বাবুয়ে, তিনের কেনিয়া এবং সাত, এগারোর আয়ারল্যান্ড’কে মিস করবে। তখন নস্টালজিক বিশ্বকাপ খুঁজে ফিরবে তার হারনো গৌরবকে।

 

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here