নিঃসঙ্গ কাঁধ

1
ছবিঃ সংগ্রহীত

জনতা ব্যাংক থেকে সারাজীবনের সঞ্চয় পেনশানের ছয় লক্ষ টাকা নিয়ে বের হলেন রিটায়ার্ড হাইস্কুল টিচার অাবু তোফায়েল। ভরা রাস্তা; মফস্বল হলেও তাঁর শহর জেলা হবার যোগ্যতা রাখে। বাজারের শেষ সীমানায় ব্যাংক। ব্যাংকের ঠিক বিপরীতে সিনেমা হল। তাঁর বাড়ি এখান থেকে বেশি দূরে নয়। মিনিট দশেকের পায়ে হাঁটা পথ। তিনি দাঁড়িয়ে রিকশা নেবেন কি নেবেন না সে দোটানার সমাধানে ব্যস্ত। রিকশা নিলে দশটাকা চলে যাবে। দুপুর বারোটার তেজস্বী রোদে দাঁড়ানোও কষ্টসাধ্য সাতষট্টি বছরের তোফায়েল সাহেবের। রাস্তার ওপারের সিনেমা হলে নজর পড়লো তাঁর। বাসায় ছোট ছেলেটা প্রায়শই বলে- ‘অামাদের ঘরে বিনে পয়সায় শো চলে’! মাঝেমধ্যে তিনিও স্বীকার করে নেন। অনিচ্ছাসত্ত্বেও যে শো’র অন্যতম প্রধান চরিত্র তিনিই। ছাত্রজীবনের দুধর্ষ মঞ্চাভিনেতাকে শেষজীবনে অাবারো অভিনয় করতে হবে সেটা ভাবেননি। সমাজের চোখে সুখি থাকার অভিনয় তিনি করে যাচ্ছেন গত দুইবছর ধরেই…

বড় ছেলে একটা ফার্ম হাউজের সেলস ম্যানেজার। অফিসের বিশাল স্ক্যামে ফেঁসে গেছে। অাট সদস্যের পরিবারে বড় ছেলে এবং মেজ মেয়ে অায় রোজকার করে তাকে সাপোর্ট দিলেও সেই ঘটনার পর তা অার হয়ে উঠছে না! হবে কি করে? অর্থ কেলেঙ্কারির মূল্য প্রায় ২০ লক্ষ যা তার মতো নিম্নমধ্যবিত্ত একজনের কাছে দুঃস্বপ্নের চেয়ে ঢের বেশি। ছেলেটা ঘরছাড়া। মেয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছে একা হাতে। এমএসসি পড়ুয়া মেয়েটা টিউশনি করে যেটুকু পায় তার সবটাই দিয়ে দিতে হয় কোন না কোন পাওনাদারকে। ছেলেটা অফিসের ইমপ্লয়ি অার ক্লায়েন্ট মিলিয়ে জনাদশেকের কাছ থেকে অজ্ঞাত কারণে ধার করেছিল। ধারের কারণ কাউকেই বলেনি। তোফায়েল সাহেবের কষ্টটা সেখানেই। যে টাকা চোখে দেখেনি, হাত দিয়ে ছোঁয়নি তার ভার কেন তাকে নিতে হচ্ছে? নিতে হচ্ছে তিনি মোটামুটি সম্মানিত একজন ব্যক্তি বলে। যিনি ৩৬ বছরের কর্মজীবনে অর্থ প্রতিপত্তির চেয়ে সুনাম কামিয়েছেন হাজারগুণ বেশি! অাশপাশের সবকটা ইউনিয়নে এক নামে পরিচিত। যার কথা শুনলে শ্রদ্ধায় মানুষ নত হয়। একজন শিক্ষকের সবধরণের নৈতিক গুণাবলিসমৃদ্ধ তোফায়েল সাহেব কখনো ভাবেননি তার অপরাহ্নের গল্পে কালির অাঁচড় লাগবে।

সম্মানের কথা চিন্তা করেই ছেলের অসীম দেনার ভার নিয়ে নিজের ও পরিবারের বাকী সদস্যদের নরকে ঠেলে দিয়েছেন। তিন মেয়ে, দুই ছেলে, স্ত্রী অার একমাত্র নাতীকে নিয়ে অাজ হেসেখেলে দিন কাটানোর কথা তাঁর। অবসরের পর নানান পরিকল্পনা এঁটে রেখেছিলেন। একটা ছোট্ট দোকান দেবেন। বাড়ীর পুরনো ঘরটা ভেঙ্গে নতুন করে তৈরি করবেন। ছোট মেয়েটা এবার কলেজে উঠেছে। ডাক্তারি পড়াবেন বলে ঠিক করে রেখেছেন।
মেজটার এমএসসি শেষ হলেই বিয়ে দেবেন। কত মানুষ হবে তা ভেবে ভেবে উনি এবং উনার স্ত্রী মিলে পুলকিত হতেন। বড় মেয়ের হাতের কাজ চমৎকার। বুটিক শপ খুলবে বলে ব্যাংক থেকে লোন নিলেও পরিবারকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য লোনের এক লক্ষ টাকার পুরোটা একজন দেনাদারকে দিয়ে বিদায় করেছেন। ছোট ছেলেটা পড়াশুনায় তেমন ভালো নয়। বাউন্ডুলে হলেও মেধাবী। কিন্তু, প্রতিভার অপচয়ে দিনকে দিন বখে যাচ্ছে। তাকে নিয়ে পরিবারের কেউই চিন্তিত ছিল না। দোকান খুললে বাপ বেটা মিলে চুটিয়ে ব্যবসা করার স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু, স্বপ্নগুলো নিমিষে দুঃস্বপ্নে রূপান্তরিত।

কয়েকদিন অাগে অফিসের বড় সাহেব বাড়িতে এসেছেন। মামলা করার হুমকি অার একসপ্তাহের মধ্যে বকেয়া ৩ লক্ষ ৮৮ হাজার টাকা পরিশোধ করার অাল্টিমেটাম দিয়ে গেছে। বাদ বাকী পাওনাদারদের কারো না কারো হুমকি ধামকি, ঘরে যাতায়াত লেগেই রয়েছে। তোফায়েল সাহেবকে নিয়ে তাঁর পুরো পরিবার চিন্তিত। রাত দুইটার দিকে হাসপাতালে নিয়ে চেকঅাপ করাতে হয়েছে। ব্লাড প্রেসার হাই। ডায়াবেটিসও নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তোফায়েল সাহেব নিজের তিল তিল করে গড়ে তোলা সম্মানের সাম্রাজ্য নিয়ে চিন্তিত। বড়মাপের সালিশি হিসেবে কয়েক মৌজায় খ্যাতি তাঁর। কত অার্থিক লেনদেনের সমাধা তুড়িতে করে ফেলেছেন। অাজ অাঙ্গুলটা নিজের দিকেই। প্রতিদিন দেনাদারদের কল অাসে বলে অাজকাল ফোন বন্ধ রেখে নিজেকে অাড়াল করার বৃথা চেষ্টা করেন। নিজের যেটুকু সম্পত্তি ছিল তার সবটা বেঁচে লাখ দশেকের মতো শোধ করেছেন। শেষ সম্বল পেনশানের ছয় লাখ টাকা। তারপরেও অারো চারলক্ষ টাকা দেনা রয়ে যায়!

দু দুবার রিক্সা ডেকেও তাতে উঠেননি। পকেটে মাত্র বারো টাকা অাছে। ভাড়া মিটিয়ে থাকবে দুই টাকা। নাতিটা ঘরে ঢুকতেই কিছু এনেছে কি না জিজ্ঞেস করে। তার বাবা তাদের রেখে চলে গেছে। বিপদে অাপন মানুষই যখন থাকে না জামাই তো দু’দিন অাগের অতিথি। তাতে অবশ্য কোন রাগ কিংবা অভিমান নেই উনার। সিনেমা হলের রঙচঙে পোস্টারের দিকে কতক্ষণ অানমনে তাকিয়ে ছিলেন বলতে পারবেন না তিনি। ফুটপাতের ফল দোকানদারের ডাকে সম্বিত ফিরে পান তিনি। ‘কি হইছে স্যার’? এত উদাসীনতার কারণ?

কিছু বললেন না তোফায়েল সাহেব। অাল্টিমেটাম অনুযায়ী অফিসের টাকা দেবার লাস্টডেট অাজকে। খাঁ খা রোদ্দুরে সারাজীবনের সঞ্চয় নিয়ে ব্যস্ত রাস্তার ভীড়ের ফাঁক গলে এগিয়ে চলছেন। কিছুদূর এগিয়ে পান-সিগারেটের দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। অাশপাশে তাকিয়ে দোকানিকে পান সাজিয়ে দিতে বললে দোকানি তা সাজিয়ে দিল। যখন সিগারেট চাইলেন, দোকানির চোখ দুটো অবাক হয়ে জ্বলতে লাগলো! দোকানের ভেতরে বসে থাকা মানুষজন হঠাৎ যেন অাকাশ থেকে পড়লো! দীর্ঘ ২৪ বছর পর সিগারেট ছুঁলেন তোফায়েল সাহেব। মুখে পান, হাতে সিগারেট, সামনে ধোঁয়ার কুন্ডলির সাথে গোটা রাস্তার মানুষগুলোর তার দিকে তাক করা অবিশ্বাসের চাহনি ঠেলে এগিয়ে চলছেন তিনি। অার মুখে বিড়বিড় করে অাউড়ে যাচ্ছেন, “It’s just the beginning of the trouble, Necessity knows no law”…
সারাজীবন ইংরেজি ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো প্রবাদসমগ্রের বাস্তব প্রতিফলন নিজের জীবনে কি একবারও কল্পনা করেছিলেন জনাব অাবু তোফায়েল? না, কল্পনায় ওসব নিয়ে ভাবতে নেই। তাই, এ-পথের পুরোটাই তার সুখের কল্পনা সড়ক…

লিখা- জহিরুল কাইয়ূম ফিরোজ।

1 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here