গেইম অব থ্রোনসঃ মৃত্যু, ধ্বংস আর কালো জাদুর পুনরুত্থান।

1
ছবিঃ সংগ্রহীত

নামঃ গেইম অব থ্রোনস

-জনরাঃ ফ্যান্টাসী টিভি সিরিজ

– সিজনঃ ৭টি
– প্রথম সিজনের সালঃ ২০১১ এর ১৭ এপ্রিল
– সর্বশেষ ৮ম সিজন রিলিজের সম্ভাব্য সময়ঃ ২০১৯ সালের ১৪ই এপ্রিল

আজকে যদি পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের ইংরেজি টিভি সিরিয়ালখোর কাউকে প্রশ্ন করা হয় এ মুহূর্তে পৃথিবীর সবচাইতে জনপ্রিয় টিভি সিরিয়ালের নাম কি? সবাই একবাক্যে উত্তর দেবে “গেইম অব থ্রোন্স”। আমার নিজেরও এ মুহূর্তে এ নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু কেনো এ সিরিজটি এতো জনপ্রিয় হলো? কি এমন আছে এতে যার কারণে পৃথিবীর বহু দেশের মানুষ এ সিরিজের চরিত্রদের নামে নিজেদের ছেলেমেয়েদের নাম রাখছে, প্রতি বছরেই এ সিরিজের সিজন গুলো কোন না কোন বড় পুরষ্কার পাচ্ছে তা নিয়েই আলোচনা।

এ সিরিজটির গল্প বুঝতে হলে বা এই রাজসিংহাসনের খেলায় যারা মেতেছে তাদের বুঝতে হলে তার আগের কিছু ঘটনা জানতে হবে। সেই ঘটনাগুলোকেই আবার ৩টি ধাপে ব্যাখ্যা করছি।

একঃ হাজার বছর আগের ইতিহাস জানতে হবে।
দুইঃ কয়েকশত বছর আগের ইতিহাস জানতে হবে।
তিনঃ কয়েক দশকের ইতিহাস জানতে হবে।
( ইতিহাস গুলো অবশ্যই গেইম অব থ্রোন্স এর কাল্পনিক ওয়ার্ল্ড অনুযায়ী)

… একঃ (হাজার বছর আগের ইতিহাস…)

ওয়েষ্টেরস। একটি কাল্পনিক জনপদ। যার আয়তন একটি মহাদেশের সমান। পৃথিবীর পশ্চিম সীমানায় ন্যারো সী নামক এক কাল্পনিক সাগরের অপর পাশে এর অবস্থান। মহাদেশের একদম উত্তরের রাজ্য হচ্ছে উইন্টারফেল। এখানে সবসময় তুষারপাত হয়, এমনকি গ্রীষ্মেও। আবার দক্ষিণের রাজ্যের নাম ডোর্ন, এটি বিস্তীর্ণ মরুভূমি। এখানে শীতকালেও তুষারপাত হয়না। ওয়েষ্টেরসের একটি বৈশিষ্ঠ্য হলো এখানে একবার শীত আসলে সহজে আর যায়না। ৭-৮ বছর পর্যন্তও স্থায়ী থাকে, আবার গ্রীষ্মকালের বেলায়ও তাই।

ছবিঃ সংগ্রহীত

এই ওয়েষ্টেরসে বসবাস করে চিলড্রেন অব ফরেষ্ট নামের এক প্রজাতি। এরা মানুষ না, রহস্যময় এক প্রজাতি। তারা ওল্ড গডসে বিশ্বাস করে। তাদের মূল শক্তি হচ্ছে জাদুবিদ্যা। ওদিকে প্রায় ১২ হাজার বছর পূর্বে এই ওয়েষ্টেরসে আসে মানুষেরা। এ মানুষদের তাই বলা হয় ফার্ষ্ট ম্যান। আর শুরু হয় চিলড্রেন অব ফরেষ্ট প্রজাতীর সাথে ফার্ষ্ট ম্যান বা মানুষদের বিরোধ। মানুষের চৌকশ সামরিক কৌশলের বিরুদ্ধে তাদের জাদুবিদ্যা। এভাবে কেটে যায় ৪ হাজার বছর। ততোদিনে মানুষেরা ওল্ড গডসদের প্রতি বিশ্বাস এনে ফেলেছে , কিন্তু তবুও সংঘাত থামেনি। এক সময় ওয়েষ্টেরসে পরে স্মরণকালের সবচেয়ে দীর্ঘতম শীত। চিলড্রেন অব ফরেষ্টরা ফার্ষট ম্যানদের প্রতিরোধ করতে মৃত এক ফার্ষট ম্যানকে জাদুবিদ্যার সাহায্যে জীবিত করে বিশেষ এক ক্ষমতা দেয় যে পরবর্তীতে নাইট কিং হয়। এ নাইট কিং মৃতদের নিয়ে তৈরী করে আর্মি অব ডেড যাদের বলা হয় হোয়াইট ওয়াকার। এ আর্মি এতোই ভয়ঙ্কর হয় যে তখন ফার্ষ্ট ম্যান বা মানুষেরা এবং চিলড্রেন অব ফরেষ্ট প্রজাতী অভ্যন্তরীণ বিরোধ ভুলে একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সামরিক শক্তি ও জাদুবিদ্যার সাহায্যে পরাজিত করে হোয়াইট ওয়াকারদের আর্মি অব ডেডদের। এরপর থেকেই ওয়েষ্টেরসে শীত মানেই এক আতঙ্কের নাম। শীতকাল মানেই হোয়াইট ওয়াকারসদের আগমনী বার্তা। কিন্তু না, এরপর আর কখনোই ওয়েষ্টেরসে আর তেমন শীত পড়েনি। হোয়াইট ওয়াকারসদেরও আর দেখা যায়নি। মানুষ আর চিলড্রেন অব ফরেষ্টেরা মিলে নর্থে একটি বিশাল ওয়াল তৈরী করে যাতে হোয়াইট ওয়াকাররা আসলেও বাধার মুখে পড়ে।

ছবিঃ সংগ্রহীত

এরপর আস্তে আস্তে চিলড্রেন অব ফরেষ্ট প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায় ওয়েষ্টেরস থেকে। এরপর আসে আরেক দল মানুষ, যাদের বলা এণ্ডাল নামে। এণ্ডালরা প্রচলন করে নূতন আরকটি ধর্মের যার নাম দেয় “নিউ গডস”। এণ্ডাল আর ফার্ষ্ট ম্যানরা মিলে ওয়েষ্টরসে প্রতিষ্ঠা করে একে একে ৬টি রাজ্য। উত্তরের উইন্টারফেলেও মানুষের বসতি বসতি শুরু হয় আর এভাবেই ওয়েষ্টেরসে তৈরী হয় ৭টি রাজ্যের। যাকে বলা হয় সেভেন কিংডম। ৭টি রাজ্যের ৬টিতেই এণ্ডালরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ও প্রভাবশালী থাকে, ৬টি রাজ্য তারাই চালাতে থাকে। কিন্তু উইন্টারফেল থাকে স্বাধীন রাজ্য যেখানে শাসন করে ফার্ষ্ট ম্যানরা। যদিও কয়েকবারই এণ্ডালরা উইন্টারফেল আক্রমণ করেছিলো কিন্তু একবারও সফল হয়নি। তারা বুঝে গিয়েছিলো হিম শীতল উইন্টারফেললেএকমাত্র ফার্ষ্ট ম্যানদের রক্তের লোকেরাই টিকতে পারবে। এভাবে যতোই বাকী ৬টি রাজ্যে এণ্ডালরা রাজত্ব করুকনা কেনো উইন্টারফেলের ফার্ষ্ট ম্যানরা তাদেরকে সবসময় সতর্ক করে দেয় “Winter is coming” বা শীত আসছে বলে। শীত যখন আসবে তখন এণ্ডালদের নিউ গডও হোয়াইট ওয়াকারদের হাত থেকে বাঁচাতে পারবেনা।

এভাবে কেটে যেতে থাকে আরো কয়েক হাজার বছর। হোয়াইট ওয়াকারদের ঘটনা পরিণত হয় লিজেন্ডারি গল্পে, আস্তে আস্তে লিজেণ্ড পরিবর্তিত হয় মিথে। মানুষ আস্তে আস্তে হোয়াইট ওয়াকারদের ঘটনা ভুলে যেতে থাকে আর এটিকে অবাস্তব রুপকথার গল্প বলে বিশ্বাস করতে থাকে।

ছবিঃ সংগ্রহীত

…দ্বিতীয়ঃ (৩০০ শত বছর আগের কথা…)

ওয়েষ্টেরস বা সেভেন কিংডমের বাইরে আরেকটি রাজ্য ভ্যালেরিয়া সভ্যতা একেবারে ধ্বংস হয়ে যায়। তখন সেই ভ্যালেরিয়ার টারগারিয়ান বংশের এগন টারগারিয়ান ও তার ২ বোন ৩টি ড্রাগনের পিঠে চড়ে ওয়েষ্টেরস আক্রমণ করে। টারগারিয়ানদের সৈন্য সংখ্যা কম থাকলেও তাদের ৩টি ড্রাগনের আগুনের আক্রমণে সহজেই এগন টারগারিয়ান ওয়েষ্টেরস দখল করে নেয় এমনকি ফার্ষ্ট ম্যানদের স্বাধীন রাজ্য উত্তরের উইন্টারফেলও দখল করে নেয়। টারগারিয়ান রাজা যেখানে অবতরণ করে সেটিকেই রাজধানী বানিয়ে সেভেন কিংডম শাসন করা শুরু করে দেয়। রাজার অবতরণের কারণে রাজধানীর নামকরণ হয় কিংস ল্যাণ্ডিং নামে। এভাবে টারগারিয়ানরা পত্তন করে আয়রন থ্রোন যারা সেভেন কিংডম রুল করবে। টারগারিয়ানদের একটি বৈশিষ্ঠ্য হলো তার ছিলো ড্রাগনব্লাড। আগুন তাদের কোন ক্ষতি করতে পারেনা। নিজেদের রক্ত পিওর রাখতে তারা নিজেদের মধ্যেই ভাইবোনের মাঝে বিয়ের প্রচলন শুরু করে দেয়। একসময় তাদের সবগুলো ড্রাগনই মারা যায়। শত্রুদের আক্রমণের বিরুদ্ধে এরপর তারা ওয়াইল্ড ফায়ার বা এক ধরণের রাসায়নিক ব্যাবহার করা শুরু করে যেটি ভয়াবহ আগুনের সৃষ্টি করতে পারে।

… তৃতীয়ঃ (১৭ বছর আগের কথা…)

তখন এরিস টারগারিয়ান নামক এক টারগারিয়ান সেভেন কিংডম রুল করছিলো। সে ছিলো খুবই অত্যাচারী শাসক। এ জন্য সে “ম্যাড কিং” বা পাগলা রাজা হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলো। সে যেখানে যখন ইচ্ছে যাকে খুশি পুড়িয়ে মারতো। Burn them all ছিলো তার বুলি। সে সময় কোন এক অজানা কারণে এগন নামক রাজপরিবারের এক টারগারিয়ান উত্তরের উইন্টারফেলের শাসক লর্ড ষ্টার্ক এর মেয়ে ইয়েনাকে অপহরণ করে। প্রতিবাদ করতে রাজধানী কিংস ল্যাণ্ডিং এ যায় লর্ড ষ্টার্ক ও তার বড় ছেলে ব্র্যাণ্ডন। কিন্তু ম্যাড কিং এরিস টারগারিয়ান তাদের দুজনকে উপস্থিত সভাসদদের সামনেই পুড়িয়ে মেরে ফেলে। তখন লর্ড ষ্টার্কের ২য় ছেলে নেড ষ্টার্ক রাজা ম্যাড কিং এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। যুদ্ধে ষ্টর্মসের রবার্ট ব্যারাথিয়ন তার সাথে একাত্মতা করে এবং জয়লাভ করে। টারগারিয়ান পরিবারের সবাইকে হত্যা করা হয়। কিন্তু রাজ্যের বাইরে থাকায় ম্যাড কিং এর ৪ বছরের পুত্র ভিসোরিস ও তার ছোট বোন ডেনেরিস বেঁচে যায়।
টারগারিয়ানদের নির্মূলের পর কিংস্ল্যাণ্ডে সেভেন কিংডমের রাজা হিসেবে আয়রন থ্রোনে বসে রবার্ট ব্যারাথিয়ন, তার হ্যাণ্ড অব কিং হয় এরিন এবং উইন্টারফেলের ওয়ার্ডেন হিসেবে নিযুক্ত হয় ষ্টার্ক পরিবারের থেকেই নেড ষ্টার্ক। এর ১৭ বছর পর হ্যাণ্ড অ কিং লর্ড এরিন মারা যায়। আর তার পর থেকেই মূলত শুরু হয় “গেইম অব থ্রোন্স” সিরিজের গল্প।

এবার সিরিজের ওয়েষ্টেরসের সেভেন কিংডম রাজ্যের নাম গুলো ও এ রাজ্য গুলো কোন কোন হাউস বা পরিবার পরিচালনা করতো তাদের নাম জেনে নেয়া যাকঃ

১) কিংস ল্যাণ্ডিং/ দ্য ক্রাউন ল্যাণ্ডস – সেভেন কিংডমের রাজধানী – হাউস টারগারিয়ান এ রাজ্যের রাজধানী পরিচালনা করতো।
২) দ্য নর্থ/উইন্টারফেল – এখানে গ্রীষ্মেও তুষারপাত থাকে। হোয়াইট ওয়াকাররা এখান থেকেই উঠে এসেছিলো। – হাউস ষ্টার্ক
৩) দ্য রিভারল্যাণ্ড – হাউস টুলি
৪) দ্য ওয়েষ্টারল্যাণ্ড – হাউস ল্যানিষ্টার
৫) দ্য আয়রন আইল্যাণ্ড – হাউস গ্রেজয়
৬) দ্য ষ্টর্মল্যাণ্ড – হাউস ব্যারাথিয়ন
৭) দ্য রিচ – হাউস টাইরেল
৮ ) ড্রোন – হাউস মার্টেল
৯) দ্য ভেইল – হাউস এরিন

গেইম অব থ্রোনস এর সিরিজ কাহিনী শুরু হয়ে যাওয়ার পর এ ৯টি হাউসই রাজ্যের মুকুট দখলের লড়াইয়ে বিভিন্ন ভাবে অবদান ও লড়াই করতে থাকে। এক হাউসের সাথে আরেক হাউসের শত্রুতা, মিত্রতা, বিশ্বাসঘাতকতা, তার ওপর আবার বিশ্বাসঘাতকতা , ষড়যন্ত্র, লোভ, প্রেম , যুদ্ধ, হিংসা ইত্যাদির সমন্বয়ে এগিয়ে চলতে থাকে গোটা সিরিজের গল্প।

সিরিজটিতে এতো এতো বেশী টুইষ্ট থাকে যে কোনটার পর কি হবে সেটি অনুমান করতেই কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। অধিকাংশ সময়ই হতভম্ব হয়ে যেতে হয় অনুমান একেবারেই না মেলার কারণে। এ জন্যই বোধহয় এ সিরিজের যদি কেউ স্পয়লার দেয় তো অনেকেই রেগে যায়, তার বারোটা বাজিয়ে দিতে চায় কেনো স্পয়েল করলো।

*বিঃ দ্রঃ
– গোটা সিরিজেই নুড ১৮+ দৃশ্যে ভরপুর, তাই কাহিনী রিভিউ পড়ে ফ্যামিলি মেম্বারদের নিয়ে সুলতান সুলেমান দেখার মতো একসাথে বসে দেখা শুরু করার কথা মোটেও কেউ ভাববেননা।
– কাটাকাটি মস্তক দ্বিখণ্ডিকরন টাইপ দৃশ্য গুলো বেশ সুন্দর করেই দেখাবে।
…হ্যাপী ওয়াচিং…

লিখাঃ মুর্তাজা আহসান তানভীর

1 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here