ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো; একটা নাম, একটা বিস্ময়ের ঘোর, হার না মানা যোদ্ধা, স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলার এক প্রেরণা!রোনালদোর জীবনটা ছিল যুদ্ধের মতো! পাড়ার বড় ভাই বা কাজিনদের দেওয়া পুরাতন জুতাগুলো পড়ে সে খেলতে নামত বাড়ির পাশের রাস্তায়। তখন শুধু আনন্দের জন্যই খেলত, আনন্দে পেতো তাই ফুটবল নিয়ে মেতে থাকত। সাত বছরের রোনালদো শুধু রাস্তায় খেলত, তার বাবা চাইত সে যেন তরুণদের মাঠে গিয়ে খেলে!

মাঠে তরুণদের সাথে খেলা শুরু করেন রোনালদো! আনন্দের পাশাপাশি তখন চলে আসে জয়ের নেশাও। তার বাবা তার খেলা খুব পছন্দ করত। উৎসাহ দিতেন মাঠে গিয়েই। তার মা বোনের ফুটবল খুব একটা পছন্দের ছিলনা; তারা মাঠে যেতেন না! কিংবা কাজের জন্য যেতে পারতেন না! রোনালদো গোলের পর গোল করে যেত। কখনো এক গোল, কখনো দু গোল, আবার কোন দিন হ্যাটট্রিক।

১১ বছর বয়সে স্পোর্টিং লিসবন একাডেমীতে চলে আসেন রোনালদো। একই দেশ, প্রায় একই ভাষা সত্ত্বেও দিনগুলো ছিল রোনালদোর জীবনের সবচেয়ে কষ্টকর! ছোট্ট রোনালদোর পরিবার ছেড়ে বাইরে থাকা, নতুন পরিবেশ। আর তার পারিবারের আর্থিক অবস্থা এতোই খারাপ ছিল যে তারা চার মাসে একবার দেখতে যেতে পারত!

ছবিঃ সংগ্রহীত

পরিবার ছেড়ে দূরে থাকা ছোট্ট রোনালদো তখন প্রতিদিন কাঁদতেন! দুঃখ ভোলার জন্য পাশে পেয়েছিলেন ফুটবল। শুরু করে দিয়েছিলেন সেরা হওয়ার লড়াই। ছাপিয়ে যেতে থাকলেন আশপাশের সবাইকে। গোলের পর গোল করতে লাগলেন।

স্পোর্টিং লিসবনের মূল স্কোয়াডে আসার আগে ১৫ বছর বয়সের রোনালদো তার কয়েকজন সতীর্থকে বলেছিলেন; ‘দেখো, আমি পৃথিবীর সেরা হব!’ তারা হেসেছিল। রোনালদো পরে ঠিকই হয়েছিল তার সময়ের সেরা ফুটবলার।

শুরুর দিকে রোনালদো অন্য সবার মতোই ছিলেন বা তাদের চেয়েও শুকনো! একদিন তার জয়ের নেশা চেপে বসে। শুরু করে অদম্য পরিশ্রম। মেধার সাথে অদম্য পরিশ্রম যোগ করেই সে আজকের রোনালদো। স্পোর্টিং লিসবনের একাডেমীতে থাকার সময়ে রাতে বাড়তি ব্যায়াম করার জন্য গোপনে ছাত্রাবাস থেকে বের হয়ে যেতো রোনালদো। এভাবেই গতি বাড়ানো, বড় হয়ে ওঠা!

ছবিঃ সংগ্রহীত

স্পোর্টিং লিসবনে খেলে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সিতে বিশ্ব মাতিয়ে রোনালদো আসে সর্বকালের সর্বসেরা ক্লাব রিয়াদ মাদ্রিদে। যেখানে এসে তার জয়ের ক্ষুধা আরো বাড়তে থাকে। সে সম্ভাব্য সকল কিছুই জিততে চায়। তার ধরনই ছিল সবকিছু জয় করা।

রোনালদো মাদ্রিদে এসেছিল ২০০৯ এর জুলাইয়ে চলেও গেছে জুলাইয়ে; মাঝে কেটে গেল নয়টি বছর। সব জেতার নয় বছর! এসে দেখেছিল ক্লাব প্রতিদ্বন্দ্বীর আধিপত্যকাল; চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী যে সব জিতে যাচ্ছে। খানিক সময় নিলেন এরপরে একে একে জিতে নিলেন সব। যাওয়ার আগে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে যাচ্ছেন রিয়াল মাদ্রিদ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে।

পৃথিবীর সর্বকালের সেরা ক্লাবের জার্সিতে ৪৩৮ ম্যাচে করেছেন ৪৫০ গোল। জিতেছেন চারটি চ্যাম্পিয়নস লীগ, তিনটি ক্লাব বিশ্বকাপ, তিন উয়েফা সুপার কাপ, দুইবার লীগ টাইটেল, দুইটি কোপা দেল রে, দুইটি স্প্যানিশ সুপার কাপ। মাদ্রিদের থাকাকালীন নয় বছরে নিজের ব্যক্তিগত ঝুলিতে জমা হয়েছে চারটি ব্যালন ডি’অর, তিনটি গোল্ডেন বুট, তিনবার উয়ফেরা বর্ষসেরা ফুটবলার, দুইবার ফিফার বেস্ট ফুটবলার! এসমস্ত অর্জন জানায় দেয় মাদ্রিদের জার্সিতে রোনালদোর প্রতিটি উদযাপন, হুংকার আর আভিজাত্য।

রোনালদো মাদ্রিদে আসার আগের পাঁচ মৌসুমে মাদ্রিদ কাটতে পারিনি চ্যাম্পিয়নস লীগের শেষ ষোলোর গেরো; রোনালদো আসার পরে মাদ্রিদ চ্যাম্পিয়নস লীগে খেলেছে আটটি আসরের সেমিফাইনাল; চারটি ফাইনাল যার সবকয়টি আবার বিজয়ী বেশে উঁচিয়ে ধরেছে ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ চ্যাম্পিয়নস লীগ টাইটেল! আবার সর্বশেষ শেষ ছয়টি চ্যাম্পিয়নস লীগের সর্বোচ্চ স্কোরার এই রোনালদো।

জীবদ্দশায় যেকোনো ক্লাবের সমর্থকরা কয়টি চ্যাম্পিয়নস জেতার স্বপ্ন দেখেন কে জানে? তবে মাদ্রিদিস্তারা তাদের প্রিয় ক্লাবকে এখনই জিততে দেখে ফেলেছে চার চ্যাম্পিয়ন লীগ; যার তিনটি আবার টানা। ভাবা যায়? অনেক ক্লাবের কাছে যা স্বপ্নেও ভাবা পাপ তা তাদের কাছে অতীত। যা সম্ভব করার অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন রোনালদো।

মাদ্রিদের জার্সিতে রোনালদোর কাটানো ৩৭৮৩১ মিনিট সবসময় মনে রাখবে মাদ্রিদিস্তারা। মাদ্রিদের জার্সিতে আপনার করা ৪৫০ গোল আর ১৩১ এসিস্ট মনে রাখবে সব মাদ্রিদিস্তারা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। রোনালদো তাদের কাছের একজন হয়েছিলেন; তার প্রস্থানে হয়তো স্বজন হারানোর ব্যথা পেয়েছে তারা।

সবাই যখন তার প্রতিদ্বন্দ্বী মেসির শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণার অপেক্ষায় ছিল; সে ফিরে এলো দোর্দন্ড প্রতাপে। অন্তত রোনালদো মেনে নিতে পারেনা সে ছাড়া অন্য কেউ হবে তার সময়ের সেরা! ব্যালন ডি’আর ব্যবধান ছিল ১-৪ মেসির সাথে; সেখান থেকে রোনালদো সমান ৫-৫ করে! চ্যাম্পিয়নস লীগ জয় রোনালদোর ছিল একটি; মেসির তিনটি। এখন রোনালদোর পাঁচটি, মেসির চারটি। আর দেশের হয়ে ইউরো জয় তো আছেই। কেউ এককভাবে মেসিকে সেরা বললে যেন চলে আসবে রোনালদোর নাম।

ছবিঃ সংগ্রহীত

রোনালদো মানে এক সর্বজয়ীর গল্প, যে আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছে কখনো হার না মানার। একদম শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার, কখনো আশাহত না হওয়ার। যার জয়ের ক্ষুধা কোটি ফুটবল সমর্থককে করেছে মুগ্ধ। রোনালদো আমাদের শিখিয়েছে স্বপ্নের পেছনে ছোটার আর সেটা সত্যি করার। এভাবেই আরো অনেকদিন চলতে থাকুক একজন রোনালদোর গল্প, এক জয়ী জীবনযোদ্ধার গল্প।

 

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here