ইউরোপা লীগ ও বিবর্তনের হাওয়া

0

ইউরোপের দ্বিতীয় সেরা টুর্নামেন্টের তকমা সাঁটানো ইউরোপা লিগের গায়ে। জমকালো আসরে প্রতিনিধিত্ব করা দলগুলির মাঝে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় দুর্দান্ত। কিন্তু, ইউরোপা লিগ কি জন্ম থেকেই এমন? না! সবকিছুর মত এতেও আছে অনেক ঘষামাজার দাগ। বিবর্তনবাদের গল্প আছে এরও। শুনবো সেসব কথাই…

মাত্রই আগের বছর সফলভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করার পর সুইজারল্যান্ড ফুটবল ফেডারেশনের সহসভাপতি আর্নেস্ট থোমেনের মাথায় আসে অভিনব এক আইডিয়া। ইউরোপের একঝাঁক বড় শহর যারা বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত তাদের নিয়ে একটি টুর্নামেন্ট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন। উদ্দেশ্য ছিল শহরগুলির প্রচার ও প্রসার। লন্ডন, বার্সেলোনা, মিলান, বাসেল, লিপজিগ, লউসেনো, বার্মিংহাম, ফ্র্যাঙ্কফুট, জাগরেব, কোলন এবং ভিয়েনা শহরের প্রতিনিধিদের সঙ্গে শলাপরামর্শ শেষে ১৮ই এপ্রিল ১৯৫৫তে মাঠে গড়ায় “ইন্টারন্যাশনাল সিটি’স ফেয়ার কাপ” নামক টুর্নামেন্ট। আলোর মুখ দেখে সুইজারল্যান্ডের ‘আর্নেস্ট থোমেন’, ইতালির ‘ওত্তোরিনো বারেসি’, এবং ইংল্যান্ডের ‘স্ট্যানলি রুস’র শৌখিন স্বপ্ন।

১৯৫৫ সালে শুরু হওয়া প্রথম আসরের শিরোপা যখন নিজেদের করে নেয় বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ তখন উঁচিয়ে ধরে টানা তৃতীয় ইউরোপিয়ান কাপ। সময়টা তখন ১৯৫৮। বার্সা তাদের প্রথম টাইটেল জিতে এ সময়! আঠারো মাসে বছর প্রবাদটিকে ছাপিয়ে ছত্রিশ মাসে বছর শেষ করে টুর্নামেন্ট কর্তৃপক্ষ। কারণটা অবশ্য বাণিজ্যিক। যেসব শহর নিয়ে আয়োজিত হয়েছিল টুর্নামেন্ট, সেসব শহরে ঠিক যখন মেলা বসত তখন খেলা হত। পরের আসরে কচ্ছপের গতি কিছুটা বাড়ে। দুই বছর স্থায়ী হয় ১৯৬০ এর আসর। সেখানেও চ্যাম্পিয়ন বার্সা।

ততদিনে ইউরোপিয়ান কাপের চর্চা লোকমুখে শুরু হয়ে গেছে। আর সেটিকে পুঁজি করে ‘কাপ উইনার্স কাপ’ নামে উয়েফা বের করে আরেকটি জাঁকালো টুর্নামেন্ট! তাতেই এমন মন্থর গতি নিয়ে টিকে থাকা দায় হয়ে পড়ে ফেয়ার কাপের। আলোর রোশনাই, মশলা, সন্ধ্যেবেলার বিনোদন সবই ছিল ফেয়ার কাপে, কিন্তু উয়েফার মত আবেদন ছিল না। তারপর তাই বছরের আসর বছরেই শেষ করতে হয়েছে সুইস ফুটবল ফেডারেশনকে। টুর্নামেন্টেও পরিবর্তন আনেন তারা। সেবার হতে প্রতি শহর হতে একটি করে এবং উয়েফার টুর্নামেন্টগুলোয় কাছে গিয়েও কোয়ালিফাই করতে না পারা একটি দল নিয়ে খেলায় তারা। ঠকে ঠকে ঠেকার কাজ থোমেন এন্ড টিম চালিয়েছে ১৯৭১ পর্যন্ত। টুর্নামেন্ট কমিটি দর্শকদের কিছু ভিন্ন স্বাদ উপহার দেন যা কিনা ফুটবলের চিত্রটাই বদলে দিয়েছে! ‘১৯৬৪, ‘৬৫-র আসরে ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয় দুই লেগে, পরবর্তীতে উয়েফা কাপেও ১৯৯৮ পর্যন্ত দুই লেগেরই ফাইনাল হত। শুধু তাই নয়। ১৬৬৬-৬৭ মৌসুমে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয় অ্যাওয়ে গোলের হিসাব, আজকের দিনে অ্যাওয়ে গোলের গুরুত্ব কতখানি তা সকলেই জানি। আর ৭১ এর শেষ সিজনে প্রচলন ঘটে ড্র ম্যাচে পেনাল্টি শ্যুটআউটে নিঃষ্পত্তির। ইন্টারন্যাশনাল সিটি’স ফেয়ার কাপের অাসল ট্রফিটি দেখতে হলে যেতে হবে স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনার জাদুঘরে, প্রথমবারের চ্যাম্পিয়ন দলের ট্রফি কেসে।

১৯৭১ এ উয়েফা নিজেদের অধীনে নিয়ে নেয় সিটি’স ফেয়ার কাপকে। কারণটা খুব সোজা। উয়েফা টুর্নামেনটগুলোকে বাণিজিকিকরণের দিকে জোর নজর দিয়েছে ক্লাব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। আর সেখানে ফেয়ার কাপ অপ্রয়োজনীয়। পেনাল্টি, অ্যাওয়ে গোল কিংবা দুই লেগের ফাইনাল এসবে ফেয়ার কাপের আকর্ষণ বাড়ে। উয়েফা সেটিকেই কাজে লাগায়। ‘উয়েফা কাপ’ নামে যাত্রা আরম্ভ করা টুর্নামেন্টের নিয়মে বদল আনে কর্তৃপক্ষ। নিয়ম করে, যোগ্য হলে যেকোন দলই খেলতে পারবে, ইউরোপের যেকোন দেশের যেকোন শহরের ক্লাব। সে শহরে মেলা বসতে হবে, বাণিজ্যে সমৃদ্ধ হওয়া লাগবে এমন কোন বাঁধাধরা নিয়মও রাখেনি কমিটি।

১৯৯২ সালে ইউরোপিয়ান কাপের নাম বদলে হয়ে যায় উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। ধারেভারে আভিজাত্যে আবেদনে ইউসিএলের পরেই উয়েফা কাপ। ২০০৯-১০ মৌসুমে তৃতীয়বারের মত বদলে যায় উয়েফা কাপের নাম! এবার রাখা হয় উয়েফা ইউরোপা লিগ। ১৯৯৮ সালে দুই লেগের ফাইনাল শেষবারের মত অনুষ্ঠিত করে বাদ দেয়া হয়। নতুবা উয়েফা কাপের খুব বেশি নিয়ম এ দফায় বদলানো হয়নি। গ্রুপ পর্বে ৪৮ দলকে ১২ গ্রুপে ভাগ করে টুর্নামেন্ট মাঠে গড়ায়, প্রত্যেক গ্রুপের সেরা দুই দল আর ইউসিএলের গ্রুপ পর্বে আট গ্রুপের তৃতীয় দল মিলিয়ে ৩২ দলের দ্বিতীয় রাউন্ডের লড়াই। এরপর পর্যায়ক্রমে ফাইনাল এবং শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here