অ-মানুষের গল্প

0
ছবিঃ সংগ্রহীত

মানুষ নিজের প্রয়োজনে গল্প গড়ে, গল্পের প্রয়োজনে নিজেকে ভাঙ্গে। শূন্য থেকে পূর্ণ হবার মাঝখানে জীবনের সঙ্গে পরিচিত হয়, বাস্তবতাকে পথচলার সঙ্গী করে অভিজ্ঞতা কুড়োয়। কারো কারো ডায়েরির পাতায় সেসব জমা হয়, কেউ কেউ ডায়েরিতেই সীমাবদ্ধ রাখার ঘোর বিরোধী। তারা চান ডায়েরির পাতাকে বইয়ের মলাটে রূপান্তর করতে। “দেবব্রত ভৌমিক”ও তেমনই একজন। “অ-মানুষের গল্প”-র মলাটে অপরিচিতের ভীড়ে অনর্গল বলে গেছেন অসুস্থ নাগরিক জীবনের অপ্রকাশিত একগুচ্ছ গল্প। গল্পেরা জীবন্ত হয়ে উঠেছে অসাধারন সাবলীলতায়, অনুপ্রেরণা খুঁজে পেয়েছে শব্দের মোড়ে মোড়ে, বর্ণের অম্লমধুর ভালবাসায়।

বড়লোকের ঘরে নতুন অতিথির আগমন মানে এলাহি কান্ড। সোনার চামচে অভিবাদন জানিয়ে জানান দেয় বিলাসিতার। আফজাল মিয়ার বিলাসিতা করার সুযোগ নেই। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়াটাই যেখানে হয়ে উঠছে না, বাকীসব নিয়ে ভাববার সময় কই! চারদিনের অমানুষিক শ্রমে বিল্ডিংটা গেঁথে তুললেও পকেটের ভীত মজবুত হয় না। টাকা দেবে বলেও মালিক ফিরিয়ে দেয়। অজ্ঞান হয়ে বউ পড়ে আছে, আফজাল এসে হাসপাতালে নিলে পৃথিবীর আলো চুমু খায় সদ্য জন্ম নেওয়া কন্যার চোখে। আফজাল ব্যথিত হয়। তাদের মতোন মানুষরা স্রষ্টার কাছে কিছু চায় না, তবুও মাঝেমধ্যে তিনি দেন। তাহলে আজ কেন দিয়েও এমন প্রহসন করছেন আফজালের সঙ্গে? এমন ফুটফুটে বাচ্চার দুটো পা-ই বাঁকা, ভাঙ্গা হাঁড় যেন তার পরিবারের দৈন্যতার প্রতীক। আফজাল সাহস করে স্রষ্টার কাছে কিছু একটা চায়। তার মেয়েটাকে যেন উঠিয়ে নিয়ে যান! ভুল ঘরে জন্ম নিয়ে জনমভর ভুলের বোঝা উঠাচ্ছে মেয়ে, চোখের সামনে তা দেখার মানসিকতা তার নেই। এই শহর অ-মানুষের। অ-মানুষের ভীড়ে প্রিয়জনও বদলে যায়। সময়ের ফেরে ছেলেবেলা দূরে মিইয়ে গিয়ে অজানা দুঃখ বাড়ায়। কালের বিবর্তনে ছোট থেকে বড় হই। কর্পোরেট সৌজন্যবোধে অাত্নার সম্পর্ককেও নামিয়ে আনি সাধারণের কাতারে। পাঁজরের সঙ্গে পাঁজরের সম্পর্ক কি আর হ্যান্ডশেকে বর্ণনা হয়? কৈশোরের দুষ্টুমিষ্টি অধ্যায়ের প্রধান চরিত্র রনিভাইকে আচমকা দেখতে পেয়ে, অনেক বছর পর তনুও কেমন যেন উদাস হয়। রনিভাই অবাক হয় না এতটুকু। অনার্সে সেকেন্ড ক্লাস পাবার পরে মা যেখানে আশীর্বাদ দেয়া বন্ধ করে দেয়, বাবা যেখানে শাপশাপান্ত করে, তনু সেখানে নস্যি।

ছবিঃ সংগ্রহীত

আজকের দিনটা অবশ্য অন্যরকম। বাবার পেনশনের টাকা গচিয়ে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার কিনেছে সে, তনুকে সঙ্গে নিয়ে বহুদিন পর ব্যস্ত নাগরিক সড়কে তাই সুর তুলে গলায়। কবির সুমনের চালশে গানের সুর, অথচ এই গানটার চালশে হবার চান্স নেই। রনিভাই অবশেষে মানুষ হতে পারলেও তনু পারে না। কিংবা বুঝতে পারে না আদতে হয়েছে কি না! হাঁতঘড়ির তিন কাঁটা আর ক্যালেন্ডারের ছ’পাতার বেড়াজালে সেও একদিন বুড়িয়ে যাবে রনিভাইয়ের মতো, হয়ত সেদিন লাভক্ষতির হিসেব কষে বুঝতে পারবে, মানুষ হতে পেরেছে কি না! লাভক্ষতির হিসেব কষতে গেলে বিনিয়োগ করতে হয়। বিনিয়োগ কত ধরনেরই তো হয়। এই যেমন সুলতান মাতব্বর তার অশিক্ষিত অকর্মার ঢেঁকি ছেলেটার সঙ্গে রিকশাচালক মালেক মেয়ের কষ্টে বানানো ডাক্তার মেয়েটার বিয়ে দেয়। এটিও বিনিয়োগ। যে বিনিয়োগে প্রাপ্ত লাভ হচ্ছে- বেকার পুত্রের খাদ্যসংস্থান! আবার বউটা ডাক্তার, এটুক বলতেও গর্ব হবে। অথচ, ডাক্তার বউয়ের বাবা মা আবার তাদের গর্ব খর্বের কারণ! রিকশাওয়ালার সাথে কি আর তাদের স্ট্যাটাস মিলে? মানিক মিয়া জীবন ছেড়ে পালাতে না পারলেও চারিদিকে বহুজন পালায়। আমেনা বেগমের ছেলে কামাল যেমন উধাও হয় একদিন হুট করেই। অসংখ্য কামাল ছড়িয়ে আছে সবখানে। তাদের অনেকেই অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়, দীপ্ত-র মতো বহুজন আবার নিজে জ্বলে অন্যকে আলো দেখান। সেই আলোয় সেঁজুতির ভালবাসা ঝলসে যায়, দীপ্তর দুই প্রিয় বন্ধু রাকিব আর সীমানা আলোর নিচে অাঁধার খুঁজে পায়! ডিপার্টমেন্টের ইতিহাসের সেরা নবীনবরণ উপহার দেয়ার চেয়েও বড় সারপ্রাইজ দেবে দীপ্ত, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি ওরা। ক্যান্সার কি ওদের বন্ধুত্বের চাইতেও বেশি শক্তিশালি, সেঁজুতির অবুঝ ভালবাসার চেয়েও বেশি চঞ্চল? কে জানে!

সব প্রশ্নের উত্তর দীপ্ত দিতে পারে ঘুচিয়ে, যেভাবে সুন্দর করে ছুঁড়ে দিয়েছে প্রশ্নগুলি… অজানার পথে একদিন সবাইকে পাড়ি দিতে হবে। কিন্তু শিউলি এভাবে পাড়ি দিতে চায়নি। স্বামী মকবুলের কিছু না থাকলেও নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস ছিল, স্ত্রীর প্রতি ভালবাসা ছিল, স্টেশনে কুঁড়ি বছর ধরে কুলির কাজ করেছে; কাজের প্রতি, ট্রেনের প্রতি মায়া ছিল। ট্রেনেই কাঁটা পড়ে ডান পা হারিয়ে মানুষটা মুষড়ে পড়ে। দুধের বাচ্চাটার মুখে খাবার তুলে দেবার জোগান নেই। যখন যা, যতটুক পারছে খাওয়াচ্ছে। বাচ্চাটাও বুঝে গেছে, সবসময় আবদারের কান্না কাঁদতে নেই। চোখের পানির দাম আছে। তাই চুপচাপ খেয়ে নেয়। সুজি, ভাতের মাঁড়! অনেক বছর পর গ্রামে যাওয়া শামীমও নিরুপায় হয়ে অচেনা নারীর স্কুটারে চেপে বসে। ডাক্তার রূপা মানুষ ভালো, গ্রামের গন্ডগোল থেকে আগন্তুককে বাঁচাতে কালবিলম্ব করেন না। রিয়াদও কাজটা করে ফেলে, পরিণতির কথা না ভেবেই। সিইও সাহেবের সেক্রেটারি হবার পর ক্রমশ পাপের বোঝা ভারীই হচ্ছে তার। এতদিন তাও মেনেছে, অমানুষটার নজর পড়েছে প্রিয়তমা সাবা-র দিকে, চুপ থাকা সম্ভব নয় এবার। বন্ধুর কাছ থেকে ব্ল্যাকল নিয়ে স্যারের কফিতে মিশিয়ে দেয়, কয়েক ফোঁটা ঘুম! পাপকে নির্মূল করতে পাপ করতে হয়, কাঁটা ছাড়া কাঁটা আর উঠবে কিসে! রিকশায় একপাশে সাবা, কানের অন্যপাশে ফোন রিসিভারে অফিস থেকে আসা কল। রিয়াদ নিজেকে অ-সাধারণ মানুষ ভাবে। অ-মানুষের শহরে সবাই অসাধারণ হতে পারে না। সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই। লেখক তার গল্পে সেই সত্যকেই ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। চেয়েছেন পরিবার, বন্ধুবান্ধব, ভালবাসার মানুষদের নিয়ে যে সমাজে বাস করছি সে সমাজের ভেতরকার চিত্র দেখাতে। জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি আমদের হাসতে হয়, কৃত্রিমতা মিশিয়ে। চলতে হয় মিথ্যে কথার বেড়াজালে জড়িয়ে। দিনশেষে সবাই মানুষ। পরস্পরের কল্যাণে, সহযোগিতায়, সহমর্মিতায় অ-মানুষরাও ঠিকই একদিন মানুষ হবে সেই বিশ্বাসে বেঁচে থাকার আনন্দেই জীবনের সার্থকতা।

• বই- অ-মানুষের গল্প

• ধরণ- গল্পগ্রন্থ

• লেখক- দেবব্রত ভৌমিক

• প্রচ্ছদ- হিমেল হক

• প্রকাশনী- বর্ষাদুপুর

• প্রথম প্রকাশ- অমর একুশে গ্রন্থমেলা, ২০১৯

• মুদ্রিত মূল্য- দুইশত টাকা

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here